Showing posts with label English Bazar. Show all posts
Showing posts with label English Bazar. Show all posts

Wednesday, October 15, 2014

Dreaded Chemicals used in Burdwan Blast

খাগড়াগড়ে বিস্ফোরক অ্যাসিড চমকে দিয়েছে গোয়েন্দাদের

সুরবেক বিশ্বাস (সৌজন্য - আনন্দবাজার পত্রিকা)

কলকাতা, ১৪ অক্টোবর, ২০১৪



5
ছোট-বড়-মাঝারি নানা মাপের কাচ আর প্লাস্টিকের বোতলে রাখা ছিল জল আর অ্যাসিডের মিশেল। খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণস্থল থেকে মেলা এই অ্যাসিডের স্বরূপ জেনে কপালের ভাঁজ বেড়েছে গোয়েন্দাদের। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (এনআইএ) গোয়েন্দাদের দাবি, ২,৪,৬-ট্রাইনাইট্রোফেনল বা পিকরিক অ্যাসিড নামে শক্তিশালী ওই বিস্ফোরক দিয়ে ‘ইম্প্রোভাইজ্ড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস’ (আইইডি) বানাত খাগড়াগড়ের কুশীলবেরা।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং বাজেয়াপ্ত বিস্ফোরক, রাসায়নিক ও আইইডি-র নমুনা পরীক্ষা করে এনআইএ-র বিশেষজ্ঞদের অনুমান, হাসান চৌধুরীর বাড়ির দোতলায় যে সব বিস্ফোরক ছিল, জনবহুল এলাকায় সে সব এক সঙ্গে ফাটলে বহু প্রাণ যেতে পারত।
গোয়েন্দাদের একাংশ বলছেন, “বিস্ফোরক সম্পর্কে জ্ঞান ও আইডি তৈরির পারদর্শিতার নিরিখে খাগড়াগড়ের জেহাদিরা হার মানিয়ে দেবে জঙ্গি সংগঠন ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন (আইএম)-এর সদস্যদের।” এনআইএ-র যে গোয়েন্দারা মুম্বই-এ ৭/১৩-র ধারাবাহিক বিস্ফোরণ, গত বছর বুদ্ধগয়ায় বিস্ফোরণ ও পটনায় নরেন্দ্র মোদীর সভাস্থলে বিস্ফোরণের তদন্ত করেছেন, তাঁদের দাবি, খাগড়াগড়ের মতো এত ভয়ঙ্কর বিস্ফোরক দিয়ে এত বেশি শক্তিশালী আইইডি এখনও পর্যন্ত তৈরি করতে পারেনি আইএম।
এনআইএ-র বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন এ পর্যন্ত প্রধানত যে ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার করে এসেছে, সেই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিধর পিকরিক অ্যাসিড। বিস্ফোরক ক্ষমতায় আরডিএক্সের চেয়ে সামান্য কম ক্ষমতা এই রাসায়নিকের। খাগড়াগড়ে বসে শাকিল বা সুবহানেরা এই অ্যাসিড কাজে লাগাচ্ছিল রীতিমতো ব্যবহার-বিধি মেনে। নানা মাপের বোতলে জলের সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছিল ওই রাসায়নিক। কারণ, অ্যাসিডটি নিজেই বিস্ফোরক। জল ছাড়া রাখা হলে যে কোনও সময়ে বিস্ফোরণ হতে পারে। কাচ-প্লাস্টিকের বদলে ধাতব পাত্রেও এই অ্যাসিড রাখা যায় না। কারণ, বিক্রিয়া করে এমন ধাতব লবণ তৈরি করে, যেগুলি বিস্ফোরক।
এক তদন্তকারী অফিসারের কথায়, “খাগড়াগড়ের কীর্তিমানদের রসায়ন সম্পর্কে ভালো জ্ঞান ছিল। আমরা জেনেছি, পিকরিক অ্যাসিডের সঙ্গে আরও কিছু তরল যোগ করে ওরা এক বিশেষ ধরনের মিশ্রণ বানাত। ওই মিশ্রণই ছিল আইইডি-র মূল বিস্ফোরক-উপাদান।” পিকরিক আ্যাসিড ছাড়া আর কী-কী উপাদান মিশিয়ে বিস্ফোরক তৈরি করা হতো, সেটা ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞেরা পরীক্ষা করে দেখছেন।
গোয়েন্দারা জানাচ্ছেন, রাসায়নিক হিসেবে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বাজার থেকে পাওয়া সহজ হলেও পিকরিক অ্যাসিড কিন্তু যে কেউ কিনতে পারে না। খনি-খাদানে বিস্ফোরণ ঘটাতে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট দিয়ে তৈরি বিস্ফোরক ‘পাওয়ার জেল’ খোলা বাজারে মেলে। তা খাগড়াগড়েও মিলেছে। কিন্তু পিকরিক অ্যাসিড যে কী ভাবে জোগাড় করা হল, গোয়েন্দারা তা ভেবে পাচ্ছেন না।
২০০৭-এর মে মাসে হায়দরাবাদের মক্কা মসজিদে বিস্ফোরণে পিকরিক অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়েছিল বলে গোয়েন্দারা সন্দেহ করেন। তার কিছু দিনের মধ্যেই ভারতীয় সেনাবাহিনী জম্মু-কাশ্মীরের একাধিক জঙ্গি ঘাঁটিতে হানা দিয়ে প্রচুর পিকরিক অ্যাসিড উদ্ধার করে। সেনা-গোয়েন্দাদের মত, জম্মু ও কাশ্মীরে নাশকতা ঘটাতে হরকত-উল-মুজাহিদিন ও লস্কর-ই-তইবার (এলইটি) মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলি এখনও পিকরিক অ্যাসিড ব্যবহার করে। এই প্রেক্ষিত মাথায় রেখে এনআইএ খতিয়ে দেখছে, শাকিলরা জম্মু ও কাশ্মীরে কোনও জঙ্গি গোষ্ঠীর সূত্রে ওই মারাত্মক বিস্ফোরক জোগাড় করেছিল কি না। কারণ, মোবাইলের ‘কল ডিটেলস’ অনুযায়ী, শাকিল বেশ কয়েকবার জম্মু ও কাশ্মীরে ফোন করেছিল। এনআইএ-র এক কর্তা বলেন, “জম্মু ও কাশ্মীরে কোনও যোগাযোগের সূত্রে খাগড়াগড়ে পিকরিক অ্যাসিড পৌঁছে থাকলে বিপদ আরও গভীরে। সে ক্ষেত্রে এলইটি, হরকত মুজাহিদিনের মতো জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে খাগড়াগড়ের যোগসূত্রের ইঙ্গিত স্পষ্ট হবে।”
তবে শুধু পিকরিক অ্যাসিড নয়, এনআইএ-কে চিন্তায় রেখেছে ঘটনাস্থল থেকে মেলা প্রায় তৈরি, দেশি প্রযুক্তির একটি রকেট লঞ্চারও। বিস্ফোরণ-কাণ্ডের আগে খাগড়াগড়ের ওই ডেরায় কোনও রকেট লঞ্চার তৈরি করা হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে কাকে, কতগুলি দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে রাজিয়া বিবি ও আলিমা বিবিকে গোয়েন্দারা জেরা করবেন।
এনআইএ-র এক তদন্তকারীর কথায়, “খাগড়াগড় মনে হচ্ছে হিমশৈলের চূড়ামাত্র। এর শিকড় কত দূর পর্যন্ত গিয়েছে তা এখনই বোঝা যাচ্ছে না। তবে উদ্ধার হওয়া জিনিসপত্র দেখে চিন্তা হচ্ছে, এ রাজ্য তথা এ দেশের আর কোথায় কোথায় এই সব মারণ-অস্ত্র রয়েছে।”

Read More: Burdwan Blast - Why Bengal police tried to undermine the incident

Tuesday, October 14, 2014

Insecurity gasps West Bengal for Inept Administration


,    ,   
 
 




           ,  !                   ,               ! ,                  ,                     ,      ,                            
,                 /       ,         !                   !        ‘’!             ,                                           ()         !    ,             !        —            !
       ,                   —           !                  ,            ,           ! ,           —       ! ,     ()                  !
  ,                    ,           ,            ,        ‘’   ! ,        ‘’  !    ,             —        —   ?        !                       —     
   ,                ! ,          ?    —         —        !        !           ?   ?     ,        !      !             —    !      ,  , , , , ,  , ---,         —     !   ?  ,    ?!      !  ,              ,    
  - ,            !                                        !                         -     —                              ,                       ! ,             
,  -        ,    —      !                                ,          ?           !!    ,    —      !    !        ,           —      ?   !    ?    !                !!
,       ,  ,     !                           !  ,          !                 ?                           ,                 —                
,                                                ,           ?!       ,              ? , -    —           ! ,                 ‘’       ,      ! ,    ,                      (!)           !   -               !          ?

Ruling party help made West Bengal the safest shelter in India for Jihadis

কওসরকে ঘরভাড়া পেতে সাহায্য করার আক্ষেপ যায়নি কাশেমের

সুনন্দ ঘোষ (সৌজন্য - আনন্দবাজার পত্রিকা)

বর্ধমান, ১৫ অক্টোবর, ২০১৪, 


4

খাগড়াগড়ের বাড়িতে তদন্তকারীরা। মঙ্গলবার। ছবি: উদিত সিংহ।

বাড়ি ভাড়া পাওয়ার জন্য সাহায্য চেয়েছিল এক জন। ইমাম হিসেবে বিভিন্ন লোকের আবেদনে সাড়া দেওয়াটাই অভ্যাস। এই আবেদনও সে ভাবেই দেখেছিলেন কাশেম মোল্লা। কিন্তু মাস তিনেক আগে ওই ব্যক্তিকে সাহায্য করার জন্য এখন আক্ষেপের শেষ নেই বর্ধমান সদরের এক মসজিদের এই ইমামের।
গোয়েন্দারা ইতিমধ্যেই জেনেছেন, বর্ধমানের বাবুরবাগে যে বাড়ির দোতলায় ডেরা বেঁধেছিল খাগড়াগড়-বিস্ফোরণের অন্যতম পাণ্ডা কওসর, সেটি ভাড়া পাওয়ার ব্যাপারে মধ্যস্থতা করেছিলেন কাশেম। এই ইমাম থাকেন বাহির সর্বমঙ্গলা এলাকায়। পরিচয়ের সুবাদে বাবুরবাগে আব্দুর রেজ্জাকের বাড়ির দোতলা ফাঁকা আছে বলে জানা ছিল কাশেমের। তাঁর দাবি, নমাজ পড়তে এসে তার সঙ্গে দেখা করে কওসর জানিয়েছিল, তার ও ভায়রাভাইয়ের পরিবারের থাকার জন্য বাড়িভাড়া দরকার। তাই তিনি রেজ্জাকের কাছে পাঠান কওসরকে।
বাড়িতে গিয়ে মঙ্গলবার কাশেমের দেখা মেলেনি। তবে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “কওসর কেমন দেখতে, তা ভুলে গিয়েছি। আমরা অনেককেই নানা ভাবে সাহায্য করে থাকি। এ ক্ষেত্রেও সে রকমই করেছিলাম। কিন্তু, এখন আমি লজ্জিত ও দুঃখিত, যে আমার মাধ্যমে এ রকম একটি লোক ঘরভাড়া পেয়েছিল। ওদের উপযুক্ত সাজা হোক, এটাই চাইছি।”
কাশেমের সঙ্গে কথা বলেছেন গোয়েন্দারা। তাঁদের ঘারণা, বাবুরবাগ বা খাগড়াগড়ের আগেও কওসর ও তার সঙ্গীরা বর্ধমান শহরের অন্দরে ঘাঁটি গেড়েছিল। বার বার এলাকা ঘুরে তারা বেশ কিছু জায়গা চিহ্নিত করেছিল, যেখানে নিরাপদে ঘাঁটি গাড়তে পারবে তাদের মনে হয়েছিল।
খাগড়াগড় ও বাবুরবাগদু’টি এলাকা জুড়েই মেস-বাড়ির ছড়াছড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়-সহ নানা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা থেকে শুরু করে, কাজের সূত্রে আসা বহু মানুষজন থাকেন সেই সব বাড়িতে। তাই এ সব এলাকায় অপরিচিত কাউকে দেখলে এলাকাবাসী চট করে সন্দেহ করেন না। এই কারণেই ডেরা বাঁধার জন্য এই এলাকাকে কওসরেরা বেছেছিল বলে ধারণা গোয়েন্দাদের।
বাবুরবাগের বাড়িটি মাস তিনেক আগে ভাড়া নিয়েছিল কওসর। তার সঙ্গে এসে উঠেছিল হবিবুর। থাকত দুই মহিলাও, যাদের বোরখা ছাড়া কখনও দেখেননি এলাকাবাসী। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অনেক ভাড়াটেই স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে মেলামেশা করেন। কিন্তু ওই বাড়ির দোতলার ভাড়াটেরা তেমন ছিল না। বাড়ির কাছেই রয়েছে একটি ক্লাব। তার সদস্য শেখ নাসিম, আব্দুল রহমানেরা বলেন, “বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা আফগানিস্তানের তিন ছাত্র গত বছর বাড়িটির নীচের তলায় থাকতেন। তাঁরা তো আমাদের ক্লাবের টিভি-তে খেলা দেখতে আসতেন। ভলিবল, ক্রিকেটও খেলতেন আমাদের সঙ্গে।”
ওই বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই একটি চালাঘরে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে থাকেন আব্দুর রেজ্জাকের ভাগ্নে ওমর হোসেন। তাঁরা জানান, কওসর সব সময়েই হেলমেট পরে থাকত। দোতলা থেকে হেলমেট পরে নেমে মোটরবাইক নিয়ে বেরিয়ে যেত। আবার ফিরে এসে মোটরবাইক রেখে হেলমেট পরেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেত।
ওমর পেশায় ধোপা। তিনি বলেন, “জামকাপড় শুকোতে দেওয়ার জন্য আমাকে ওই বাড়ির ছাদ ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু ওরা আসার পরে আমাকে ছাদে উঠতে দিতে বাধা দেয়। জোরাজোরি করায় ছাদে যেতে দিত। তবে গলা খাঁকারি দিয়ে উপরে উঠতে বলেছিল।” তাঁর স্ত্রী সালমা বলেন, “এরা আমাদের সঙ্গে কখনও কথা বলত না। যে দুই মহিলা ছিল, তাদের তো বোরখা ছাড়া দেখিইনি।”
কওসরের সঙ্গী বোরখা পরা দু’জন মহিলা কি না, তা নিয়ে আবার সংশয় রয়েছে বাড়িটির নীচের তলায় থাকা ছাত্রদের। চাকরির নানা পরীক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে বর্ধমানে আসা এই ছাত্রেরা মেস করে ওই বাড়িটিতে রয়েছেন বছরখানেক। ২ অক্টোবর বিস্ফোরণের পরে, বাবুরবাগের বাড়ির দোতলায় আলো জ্বলতে দেখে মালিককে খবর দেন তাঁরাই।
পর দিন সকালে মালিক এসে দেখেন, দু’টি ঘর বন্ধ করে ভাড়াটেরা পালিয়েছে। বাড়িটির সন্ধান মেলার পরে দোতলার পাশাপাশি নীচের তলাও তালাবন্ধ করে দিয়ে দিয়েছে পুলিশ। তাই সেখানে ফিরতে পারছেন না ওই ছাত্রেরা। তাঁদেরই এক জন, মঙ্গলকোটের হাফিজুর রহমান ফোনে বলেন, “হেলমেট পরা লোকটিকে নামতে-উঠতে দেখে কয়েক বার ‘সালাম আলেকুম’ বলেছি। প্রত্যুত্তর দেয়নি। বাকি দু’জন মহিলা না পুরুষ, তা বুঝতেই পারিনি। কারণ, তারা পুরোপুরি বোরখায় ঢাকা থাকত। কখনও সাড়া বা গলার আওয়াজ পাইনি।” আর এক ছাত্র, গলসির সৈয়দ আবু শাহিদ বলেন, “যে লোকটা হেলমেট পরত না, সে দাড়িওয়ালা। পাশ দিয়ে যাতায়াত করলেও কখনও কথা বলেনি।”
পুজো ও ঈদের ছুটি শেষে ৯ অক্টোবর ফেরার কথা ছিল ওই ছাত্রদের। কিন্তু পুলিশ ঘরে তালা দিয়ে যাওয়ায় তাঁরা ফিরতে পারেননি। তাঁরা জানান, ভিতরে বইপত্র রয়ে গিয়েছে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে পরীক্ষা রয়েছে। কী ভাবে সেই পরীক্ষা দেবেন, তা নিয়েই এখন চরম দুশ্চিন্তায় কওসরের ডেরার নীচের তলার ওই ছাত্রেরা।

***************

ফিরলে পুলিশে দেব, বললেন হবিবুরের মা

মহেন্দ্র জেনা (সৌজন্য - আনন্দবাজার পত্রিকা)

বোলপুর, ১৫ অক্টোবর, ২০১৪, 


5

হবিবুর এবং তাঁর মা জ্যোৎস্না বিবি। ছবি: বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী।

ছবি দেখেই বৃদ্ধা বলে উঠলেন, “এই তো আমার ছেলে!” খানিক পরে তাঁর স্বগতোক্তি, “যদি ও ফেরে, পুলিশে ধরিয়ে দেব।”
বৃদ্ধা হলেন হবিবুর শেখের মা। আর হবিবুর? খাগড়াগড়-কাণ্ডের সৌজন্যে নামটা আর অপরিচিত নয়। গোয়েন্দারাই জানিয়েছেন, ওই বিস্ফোরণ-কাণ্ডে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ কওসরের সঙ্গী এই হবিবুর। বর্ধমান শহরের বাবুরবাগের যে বাড়িতে কওসরের মূল ডেরা ছিল বলে তদন্তে উঠে আসছে, বীরভূমের হবিবুরের মাধ্যমেই সেই বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল বলে গোয়েন্দারা জেনেছেন। ওই বাড়িটির মালিকের বর্ণনা শুনে হবিবুরের স্কেচও আকানো হয়েছে।
সেই হবিবুরের মা জ্যোৎস্না বিবি মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমে নিজের ছেলের ছবি দেখেই চমকে উঠলেন। খাগড়াগড় বিস্ফোরণের ঘটনা তিনি প্রতিবেশীদের মুখে শুনেছেন। তাঁদের বাড়িতে গিয়ে টিভিতে দেখেছেনও। পড়শিদের মুখে শুনেছেন ওই বিস্ফোরণ-কাণ্ডে নাম জড়িয়েছে ছেলের। বোলপুরের মুলুক এলাকায় শান্তিপল্লির বাড়িতে বসে বছর পঞ্চাশেকের ওই মহিলা বললেন, “শুনেছি, আমার ছেলে ওই ঘটনায় জড়িত। তা সত্যি হলে ও ফিরলে আমিই ওকে পুলিশে ধরিয়ে দেব!”
গলা কিন্তু এতটুকুও কাঁপেনি!
তাঁর সঙ্গে হবিবুরের শেষ দেখা বছর দুয়েক আগে। সেই দিনের কথা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, “বছর দুয়েক আগে আমার অপারেশন হয়। অপারেশনের দিন ও আমায় দেখতে এসেছিল। পর দিন রাতেই নিজের জামাকাপড় নিয়ে ঘর ছাড়ল। কাউকে কিচ্ছু বলে গেল না!” বোলপুরের আরতি সিনেমার কাছে আগে একটি পানগুমটি ছিল হবিবুরের বাবার। হাবিবুর বাবার সঙ্গে দোকানে বসত মাঝে মাঝে। বাবা মারা গেলে সেই গুমটিতেই হবিবুর বসত। এ দিন হবিপুরের বিবাহিতা দুই দিদি টুম্পা ও ছবি বলেন, “মাঝরাতে নিজের পোশাক নিয়ে পালালেও দোকানের চাবি রেখে গিয়েছিল ভাই।” সেই দোকানটি এখন বিক্রি করে দিয়েছে ওই পরিবার।
গোয়েন্দারা জেনেছেন, হবিবুর মাস দুয়েক আগে বাবুরবাগে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেছিল। সেখানেই তার সঙ্গে কওসর ও তার স্ত্রী জিন্নাতুর ওরফে লক্ষ্মী থাকত। লক্ষ্মীর দাদা কদর গাজীর বাড়ি কীর্ণাহারের নিমড়া গ্রামে। হবিবুরের এক দিদি এ দিন বললেন, “কদরের এক বোনের সঙ্গে হবিবুরের বিয়ে হয়েছে বলে আমরা শুনেছি। কিন্তু, ওর বউকে কখনও চোখে দেখিনি।” বর্ধমান বিস্ফোরণের পর থেকেই স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে কদর। হদিস নেই হবিবুরেরও।
কেন পালাল হবিবুর , সে প্রশ্নের উত্তর নেই তার পরিবারের কাছে। তবে, এ দিন তার মা-দিদিদের মুখে বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে শান্তিপল্লিরই বাসিন্দা ডালিম শেখের কথা। জ্যোৎস্না বিবির দাবি, “পালিয়ে যাওয়ার কিছু দিন আগে থেকেই ডালিমের সঙ্গে মাখামাখি শুরু হবিবুরের। তার পর থেকেই ধর্ম নিয়ে মাতামাতি শুরু করেছিল ছেলে।”
বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণের পরে বিভিন্ন জেলায় দুষ্কৃতীদের নানা যোগসূত্র বের করছে গোয়েন্দারা।
মঙ্গলবার সিউড়িতে বীরভূম জেলা পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলে
বেরিয়ে আসছেন এনআইএ-এর সদস্যরা।—নিজস্ব চিত্র।
ডালিমের আচরণ যে ‘রহস্যজনক’, সে কথা জানাচ্ছেন প্রতিবেশীরাও। পেশায় বাসনের ফেরিওয়ালা হলেও তাঁরা ডালিমকে একাধিক ল্যাপটপ ব্যবহার করতে দেখেছেন। এ দিন ডালিমের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, দরজায় তালা ঝুলছে। স্থানীয় সূত্রের খবর, বছর ছয়েক আগে শান্তিপল্লিতে এসে সপরিবার থাকতে শুরু করেন ডালিম। বলেছিলেন, নলহাটির লোহাপুরে তাঁর আদি বাড়ি। ঈদের পর থেকেই ডালিমের দেখা মিলছে না বলে পড়শিরা জানান। জানা গিয়েছে, বহিরাগত তিন ব্যক্তিকে বছরখানেক আগে এই এলাকায় একটি খাস জমি কেনার বন্দোবস্ত করে দেয় ডালিম। সেই জমিতে ওই তিন জন নিজেরাই বাড়ি তৈরি করে। বাইরের কোনও মজুর-মিস্ত্রি নেয়নি তারা। পরিচয় দেয় বাসনের ফেরিওয়ালা হিসেবেই। আশপাশের লোকজন জানাচ্ছেন, পরিবার নিয়ে এলেও এলাকায় তারা মিশত কম। বাড়ির মেয়েদের বোরখা ছাড়া কার্যত দেখাই যেত না।
সেখানে গিয়ে দেখা গেল, উঁচু টিনের বেড়া দেওয়া তিনটি বাড়িতেই তালা বন্ধ। এক জনের বাড়ির উঠোনে পড়ে কার্তুজ। স্থানীয় সিয়ান-মুলুক পঞ্চায়েতের সদস্য প্রশান্ত মুখোপাধ্যায় বলেন, “কয়েক মাস আগে পঞ্চায়েত অফিসে এসেছিল ওই তিন জন। বাড়িতে চার চাকা যাওয়ার রাস্তার জন্য দাবি নিয়ে। আমরা বৈধ কাগজপত্র চাইলে ওরা আর ফিরে আসেনি।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, ওই তিন জনেরই এক জনের বাড়িতে এ বছর দোলে হবিবুর এসেছিল। নিজের বাড়ি যায়নি। পরিবারের দাবি, সেখানেই হবিবুরের বিয়ে হয়। কিন্তু সে বাড়ির কাউকে ডাকেনি। হবিবুরের দিদি টুম্পা বলেন, “গ্রামে এসে বিয়ে করল, অথচ ডাকল না আমাদের! যে ভাইকে চিনতাম, সে অন্য হাবিবুর। ছেলেটা এতো বদলাল কী করে, বুঝতে পারছি না।”

****************

বছরখানেক ধরে অন্যত্রও বিস্ফোরক বানিয়েছে শাকিলরা

সুরবেক বিশ্বাস (সৌজন্য - আনন্দবাজার পত্রিকা)

কলকাতা, ১৫ অক্টোবর, ২০১৪


খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণের পরে বর্ধমানে যে জঙ্গি মডিউল বা গোষ্ঠীটির হদিস মিলেছে, পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে বসে তারা অন্তত বছর খানেক ধরে আইইডি (ইম্প্রোভাইজ্ড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বানিয়ে গিয়েছে এমনটাই মনে করছে এনআইএ।
জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য, বর্ধমানের উপকণ্ঠে অস্ত্র ও বিস্ফোরকের গবেষণাগার তথা কারখানাটির হদিস ২ অক্টোবর মিলেছে ঠিকই, তবে রাজ্যের অন্য জায়গায় অন্তত এক বছর ধরে ওই একই চক্র আইইডি তৈরি করেছে। এর বেশির ভাগটাই বাংলাদেশে পাচার করা হয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করছে তদন্তকারীরা। শুধু তা-ই নয়, তদন্তকারীরা জেনেছেন, জেহাদি ভাবধারায় এ দেশের এক দল পুরুষ ও মহিলাকে উদ্বুদ্ধ করে বাংলাদেশে নাশকতা ঘটানোর জন্য তাদের দিয়ে মারণাস্ত্র তৈরি করাতে মাসের পর মাস ‘ক্লাস’ নিত ভিনদেশ থেকে আসা কয়েক জন লোক। বিস্ফোরণ-কাণ্ডে ধরা পড়া রাজিয়া বিবি ওরফে রুমি কিংবা আলিমা বিবিদের এমন ভাবে মগজধোলাই করা হয়েছিল যে, ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তারা অনায়াসেই অন্য দেশে নাশকতা ঘটানোর চক্রান্তে যুক্ত হতে পেরেছিল। গাজা ভূখণ্ডের সাম্প্রতিক সংঘর্ষে প্যালেস্তাইনি শিশুদের উপর ইজরায়েলি হামলার বাছাই করা ভিডিও পর্যন্ত মহিলাদের দেখিয়ে তাদের ‘উদ্বুদ্ধ’ করা হয়েছিল। গোয়েন্দাদের দাবি, ধৃত রাজিয়া ও আলিমা এবং বিস্ফোরণে জখম আব্দুল হাকিমকে জেরা করে এমনই ইঙ্গিত মিলেছে। তা ছাড়া, বর্ধমানের শিমুলিয়া মাদ্রাসা-সহ কয়েকটি সন্দেহজনক জায়গা থেকে মেলা নথিপত্রও একই দিকে ইশারা করছে। 
তদন্তকারীদের বক্তব্য, ধৃতদের মুখ থেকে এখনও এই ব্যাপারে সরাসরি কথা বার না-করা গেলেও তাদের জেরা করে বোঝা যাচ্ছে, ২০১২-তে ওই চক্রের সদস্যদের আইইডি তৈরির প্রশিক্ষণ নেওয়ার প্রাথমিক পাঠ শেষ হয়। পরের বছরই তারা পুরোদস্তুর ‘কাজে’ নেমে পড়ে। এক গোয়েন্দা অফিসারের কথায়, “যা মনে হচ্ছে, খাগড়াগড়ে ওই কারখানা বা গবেষণাগার তৈরি হওয়ার বছর খানেক আগেই আইইডি উৎপাদনের ওই রকম অন্তত একটি জায়গা তৈরি করা হয়। আর সেখানে বানানো শ’য়ে শ’য়ে আইইডি এবং অন্যান্য মারণাস্ত্র পাচার করা হয়েছে বাংলাদেশে।” এনআইএ-র এক অফিসারের মতে, “প্রচুর সংখ্যায় আইইডি তৈরির বরাত তাদেরই দেওয়া হবে, যাদের এই ব্যাপারে ভাল রকম অভিজ্ঞতা রয়েছে। কাজেই, নিঃসন্দেহে খাগড়াগড়ে ডেরা বাঁধার অনেক আগেই হাত পাকিয়েছিল শাকিল, সুবহানেরা।”
খাগড়াগড়ের আগে কোথায় তৈরি করা হয়েছিল আইইডি উৎপাদনের সেই কারখানা?
ওই গোয়েন্দা-কর্তা বলেন, “আমরা সেটাই খুঁজে বের করারচেষ্টা করছি। তবে বিশেষ একটিসূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, সম্ভবত মুর্শিদাবাদ জেলায় বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কোনও জায়গাতেই ওই রকম এক বা একাধিক কারখানা তথা গবেষণাগার গড়ে তোলা হয়েছিল।” ওই কারখানার সম্ভাব্য জায়গা হিসেবে লালগোলা ও বেলডাঙাকে পাখির চোখ করে তল্লাশি চালাচ্ছেন ও খোঁজখবর নিচ্ছেন তদন্তকারীরা।
অন্তত বছর খানেক ধরে এহেন জঙ্গি কার্যকলাপ চললেও সেটা জেলা পুলিশ ও রাজ্য গোয়েন্দা শাখার (আইবি) নজর কী করে এড়িয়ে গেল, সেই প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের অন্দরেই। তাঁদের বক্তব্য, সে ক্ষেত্রে একই ভাবে ব্যর্থ হয়েছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ইনটেলিজেন্স ব্যুরো, সেনা গোয়েন্দা ও বিএসএফের গোয়েন্দা শাখাও।
রাজ্য পুলিশের এক শীর্ষকর্তা অবশ্য বলেন, “জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-সহ বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলা ওই জঙ্গি মডিউল সম্পর্কে আমাদের কাছে খবর ছিল না ঠিকই, তবে বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে সম্প্রতি নদিয়া, মুর্শিদাবাদ ও বাংলাদেশ সীমান্তে আমরা নজরদারি অনেকটা বাড়িয়েছি।” ওই পুলিশ কর্তার কথায়, “আমরা এখনও মনে করি, ওই নজরদারি বাড়ানোর ফলেই মুর্শিদাবাদের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বোমা তৈরির কারখানা সরিয়ে আনা হয়েছিল বর্ধমানের উপকণ্ঠে।”
ধৃত আব্দুল হাকিম এবং দুই মহিলা রাজিয়া ও আলিমার কাছ থেকেই এই ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলবে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা। তাঁদের দাবি, জেরার সময়ে রাজিয়াকে বার বার প্রশ্ন করা হয়েছে, ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও কেন সে জেএমবি-র মতো বাংলাদেশি জঙ্গি সংগঠনের কাজে নিজেকে যুক্ত করতে গেল? তদন্তকারীরা জেনেছেন, ধর্মীয় ভাবাবেগে সুড়সুড়ি দিয়ে ও নিয়মিত মাসোহারার বিনিময়েই তাদের এই বিপজ্জনক কাজে সামিল করা হয়।
এক গোয়েন্দা-অফিসারের কথায়, “রাজিয়া বিবিরা বাংলাদেশি নয়।
তার ঠাকুর্দাও নদিয়ার করিমপুরের বাসিন্দা। এর পরেও রাজিয়া কী করে বাংলাদেশের কোনও জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হল, সেটাই প্রশ্ন।” ওই অফিসার জানান, রাজিয়ার স্বামী, বিস্ফোরণে নিহত শাকিল আহমেদ জেএমবি-র সদস্য বলে প্রাথমিক ভাবে মনে হচ্ছে। “তবে শুধু স্বামীর সূত্রে নয়, মাসের পর মাস রীতিমতো ক্লাস নিয়ে রাজিয়াদের জেহাদি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। যার পরিণতিতে নাশকতায় সামিল হওয়ার সময়ে রাজিয়ার মাথায় থাকেনি, সে কোন দেশের নাগরিক,” বলছেন ওই অফিসার।

***************

পড়শি রাজ্যেও গিয়েছে ফেরার ইউসুফদের ছবি

নিজস্ব সংবাদদাতা (সৌজন্য - আনন্দবাজার পত্রিকা)

কলকাতা, ১৫ অক্টোবর, ২০১৪, 

বর্ধমান বিস্ফোরণ কাণ্ডের সন্দেহভাজনরা দেশের বাইরে পালাতে পারেনি বলেই মনে করছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। আশপাশের রাজ্যে গা-ঢাকা দিয়ে থাকাটাও কঠিন করে তুলতে তাঁরা এখন উঠে পড়ে লেগেছেন।
প্রধান অভিযুক্ত মহম্মদ ইউসুফ ফেরার। গা-ঢাকা দিয়েছে আরও ৯ জন। তদন্তে তাদের যে সব ছবি পাওয়া গিয়েছে, তার প্রতিলিপি ইতিমধ্যেই বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা বা উত্তরপ্রদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে পাঠানো হয়েছে। সন্দেহভাজনরা কেন দেশ ছাড়তে পারেননি বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা? তাঁদের যুক্তি, দেশের বাইরে পালাতে চাইলে বাংলাদেশেই স্বাভাবিক গন্তব্য হওয়া উচিত এই জঙ্গিদের। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার জঙ্গি দমনে পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র্যাব)-কে অভিযানে নামানোর ফলেই এ বাংলায় আসতে বাধ্য হয় জামাতের দুষ্কৃতীরা। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার বর্ধমান বিস্ফোরণের কথা জেনেছে। ফলে, বর্ধমান কাণ্ডের পরে বাংলাদেশের পুলিশের সামনে গিয়ে পড়তে চাইবে না ইউসুফরা। গোয়েন্দারা জেনেছেন বাংলাদেশের রাজশাহি জেলার আহলে হাদিস ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিই ছিল পালিয়ে গিয়ে ইউসুফদের মাথা গোঁজার ঠাঁই। কিন্তু, বর্ধমান কাণ্ডের পরে সেখানেও তল্লাশি অভিযান চালান হয়েছে বলে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন।
ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, “বর্ধমান বিস্ফোরণ কাণ্ডে যে নামগুলি পাওয়া গিয়েছে, নিয়মমাফিক সে বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া চলছে। সীমান্ত এলাকাতেও যাতে দুষ্কৃতীরা ঘাঁটি গাড়তে না পারে, তার জন্যও নজরদারি চলছে, যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
তদন্তকারীরা বলছেন, বাংলাদেশ ছাড়া নেপালে পালিয়ে যাওয়ার একটি সম্ভাবনা ছিল। এর আগে ভারতীয় ভূখণ্ডে নাশকতামূলক কাজের পরে নেপালে পালিয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, নেপালের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এখন বন্ধুত্বপূর্ণ। তাই সেখানকার পুলিশ ও গোয়েন্দাদের কাছ থেকে যথাসম্ভব সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক অতীতে নেপাল পুলিশের সাহায্য নিয়েই ইয়াসিন ভাটকলের মতো জঙ্গিদের ধরা গিয়েছে। গোয়েন্দারা বলছেন লুকনোর জন্য ইউসুফরা কোনও ধর্মীয় স্থানই পছন্দ করে। নেপালে তেমন সুযোগ অল্প।
গোয়েন্দাদের ধারণা, তাই বেশি দূর যেতে পারেনি ইউসুফরা। নিম্ন অসমের সঙ্গে যে হেতু ইউসুফ-শাকিলদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, তাই অসমে পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার দিকটিও খতিয়ে দেখা হয়েছে। সেখানে কড়া নজরদারি শুরু করেছে এনআইএ। জামাতুল মুজাহিদিন জঙ্গিদের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ইতিমধ্যেই অসম থেকে ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে অসমে পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি হয়তো নেবে না ইউসুফরা। ধরপাকড় শুরু হয়েছে অন্য রাজ্যেও। চেন্নাইয়ে তিন যুবককে আটক করেছে পুলিশ। বর্ধমান কাণ্ডের সঙ্গে তাদের কোনও যোগাযোগ রয়েছে কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শাকিলের মোবাইল কললিস্ট থেকে জানা গিয়েছে, চেন্নাইয়ে সে বেশ কয়েক বার ফোন করেছিল।
এনআইএ-র এক কর্তার কথায়, “ইউসুফরা বিস্ফোরণের পরেও দু’তিন দিন শিমুলিয়ার মাদ্রাসায় ছিল বলে জানতে পেরেছি।” এই তথ্য জানা গিয়েছে ওদের মোবাইল ঘেঁটে। কিন্তু, তার পর থেকেই ইউসুফদের মোবাইল ফোন বন্ধ করা আছে। গোয়েন্দাদের সন্দেহ, সম্ভবত কোথাও গিয়ে নতুন সিম নিয়েছে পলাতকেরা। কিন্তু, যে ভাবে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, তাতে খুব একটা শান্তিতে নেই তারা।

Read More : West Bengal Police tried to hush up blast cases and destroying evidences

West Bengal Police tried to hush up blast cases and destroying evidences

এনআইএ-পাহারায় আসছে এনএসজি

সৌমেন দত্ত (সৌজন্য - আনন্দবাজার পত্রিকা)

মঙ্গলকোট, ১৫ অক্টোবর, ২০১৪


1

বেলডাঙার পাওয়ার হাউস পাড়ায় ভাড়া নেওয়া শাকিলের বাড়িতে এনআইএ-র দল। ছবি: গৌতম প্রামাণিক

শিমুলিয়ার মাদ্রাসায় মাটির নীচে কিছু আছে জানিয়ে দিয়েছে বম্ব স্কোয়াড। একটি সুড়ঙ্গেরও আভাস মিলেছে। যদিও সেখানে কতটা বিপদ অপেক্ষা করছে, তা অজানা।
এই পরিস্থিতিতে এনআইএ-র তদন্তকারীদের সুরক্ষা দিতে আজ, বুধবার বর্ধমানের মঙ্গলকোটে ওই মাদ্রাসায় ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ডের (এনএসজি) আসার কথা। দু’দিন হল শিমুলিয়ায় তদন্তে নেমেছে এনআইএ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিআইডি-র বম্ব স্কোয়াডেরা লোকেরা চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে রিপোর্ট দেওয়ার পরেই তড়িঘড়ি এনএসজি নামানোর সিদ্ধান্ত হয়। এ দিনই ডিআইজি (এনআইএ) অনুরাগ তনখা বর্ধমানে পৌঁছন। তাঁর সঙ্গে সিআরপি-র একটি দলও শিমুলিয়ায় যাচ্ছে।
জঙ্গি মোকাবিলায় বিশেষ ভাবে পারদর্শী এনএসজি-কে সাধারণত দু’টি ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় এক) পণবন্দিদের মুক্ত করা বা দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে শত্রুর ডেরায় হানা দেওয়া। যেমন দেখা গিয়েছিল মুম্বইয়ে ২৬/১১-র জঙ্গি আক্রমণের সময়ে। দুই) কিছু ক্ষেত্রে ভিভিআইপি-দের নিরাপত্তা দিতে। শিমুলিয়ায় এনএসজি-কে পাঠানোর দু’টি কারণই রয়েছে।
সিআইডি সূত্রের খবর, শিমুলিয়ার মাদ্রাসায় যে সুড়ঙ্গের আভাস মিলেছে, তার ভিতরে তল্লাশি চালাতে গেলে বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। তা এনএসজি-রই আছে। সম্ভবত সেই কারণেই বম্ব স্কোয়াডের কাছ থেকে সুড়ঙ্গের কথা শোনা মাত্র এনএসজি কম্যান্ডোদের ডেকে পাঠানো হয়েছে। যদিও এনআইএ-র একটি সূত্রে দাবি করা হয়েছে, তারা এনএসজি-কে ডাকেনি, আবার আসতে বারণও করেনি। কারণ পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে তদন্ত চালাতে গিয়ে অফিসারেরা আক্রান্ত হতে পারেন, সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
খাগড়াগড় বিস্ফোরণের তদন্তে কেন্দ্রীয় সংস্থা নামার পরেই তদন্তের গতিপ্রকৃতি পাল্টে গিয়েছে। প্রথমটায় পুলিশ যে ঢিলেঢালা মানসিকতা দেখিয়েছে, তাতে কেন্দ্রীয় অফিসারেরা যথেষ্ট বিরক্ত। বিস্ফোরণের দিন তিনেকের মধ্যেই শিমুলিয়া মাদ্রাসার কথা জানতে পেরেছিল বর্ধমান পুলিশ। কিন্তু তারা দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনেক মালপত্র সমেত এখানকার লোকজন সরে পড়তে পেরেছে বলে সন্দেহ এনআইএ-র। সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় ফরেন্সিক দল গিয়ে মাদ্রাসার সামনে পড়ে থাকা ন্যানো গাড়িটিও পরীক্ষা করে। ওই গাড়িতেই ইউসুফ ও তার সঙ্গী বোরহান শেখ ঘোরাফেরা করত বলে এলাকার লোকজন গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন। গাড়িটির ভিতরে রক্তের দাগ ও কিছু জামাকাপড় মিলেছে।
এ দিন সকাল ১১টা নাগাদ ডিএসপি পদমর্যাদার এক আধিকারিকের নেতৃত্বে এনআইএ-র চার সদস্যের দল শিমুলিয়া পৌঁছয়। সঙ্গে ছিল পুলিশ। বাড়ির পিছনের দিকে মাটি থেকে ফুটখানেক উপরে ছোট-ছোট জানলা। ঘরে খাট নেই। মেঝেয় শুয়ে কথা বললে যাতে বাইরে দাঁড়িয়ে তা শোনা না যায়, সে জন্যই এত নিচু জানলা তৈরি করা হয়েছিল বলে গোয়েন্দাদের অনুমান। এখানে ২০-২৫ জন থাকত বলে জানান তাঁরা। বাড়িটির ভিতরে একটি কুয়োয় তল্লাশি চালিয়েও কিছু মেলেনি।
পালানোর আগে সন্দেহভাজন জঙ্গিরা কিছু মালপত্র ফেলে দিয়ে থাকতে পারে সন্দেহে দুপুর ১২টা নাগাদ মাদ্রাসার পাশের পুকুরে লোক নামানো হয়। তাতে বিশেষ কিছু পাওয়া যায়নি। পাড়ে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছিলেন এনআইএ-র অফিসারেরা। তল্লাশি চালিয়েও ডোবা থেকে যখন কিছু মিলছে না, এক অফিসার আক্ষেপ করেন, “এখানে জেহাদের প্রশিক্ষণ চলছিল। তিন-চার দিন সময় পেয়েই পালিয়ে গিয়েছে।” কিন্তু অফিসারদের সন্দেহ যায়নি। পুকুরের মালিককে রাতের মধ্যে সব জল তুলে ফেলতে বলা হয়েছে।
দুপুর দেড়টা নাগাদ মাদ্রাসা থেকে সামান্য দূরে বোরহানের বাড়িতে যায় এনআইএ-র দল। প্রথমে ঢুকতে দিতে চাননি পরিবারের লোকজন। জোর করে দরজা খুলিয়ে ঢোকেন অফিসারেরা। ভিতরে গিয়ে বোরহানের মা, বৌদি ও দিদিমার সঙ্গে কথা বলেন তাঁরা। নানা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময়ে মা আসুরা বিবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তিনি বলেন, “আমি এক হতভাগী মা। ইউসুফকে মাদ্রাসার জমি দিয়ে আমার ছেলে বড় ভুল করেছে। ইউসুফ ও তার স্ত্রী আয়েষা মাদ্রাসাতেই থাকত। বোরহানের স্ত্রী সাহনওয়াজও ওখানেই থাকত। ঈদুজ্জোহার চার দিন আগে ওরা চলে গিয়েছে।” বোরহানের কাকা সফিকুল শেখকেও ডেকে পাঠিয়ে জমি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে এনআইএ।
দুপুর ২টো নাগাদ এনআইএ-র একটি দল খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণস্থলে যায়। সেখানে থাকা সমস্ত নমুনা পুলিশের কাছ থেকে বুঝে নিয়ে রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ বাড়িটি ‘সিল’ করে বেরিয়ে যায় তারা। ওই সব নমুনা কেন্দ্রীয় ফরেন্সিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হবে বলে এনআইএ সূত্রে জানা গিয়েছে। বিকেলে মঙ্গলকোট থানায় বসে ঘণ্টা তিনেক ধরে শিমুলিয়া মাদ্রাসার পরিচালক ইউসুফ শেখের মোবাইল ফোনের টাওয়ার লোকেশনের গতিবিধি লক্ষ করেন এনআইএ অফিসারেরা।
এ দিন দুপুরেই মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা থানায় আসেন এনআইএ-র তিন গোয়েন্দা। দুপুর সওয়া ১টা নাগাদ তাঁরা বেলডাঙার পাওয়ার হাউস পাড়ার অলিওল ইসলামের বাড়ি যান। অলিওলের এই বাড়িই গত প্রায় তিন বছর ধরে ভাড়া নিয়েছিল খাগড়াগড় বিস্ফোরণে হত শাকিল আহমেদ। এ দিন এনআইএ যাওয়ার আগেই সিআইডি সেখানে গিয়ে অলিওলকে জেরা করে। পরে এনআইএ অফিসারেরা গিয়ে প্রচুর ছবি তোলেন। শাকিল যে ঘরে থাকত, সেখান থেকে তাঁরা দু’টি ব্যাগও উদ্ধার করেছেন। সেই ব্যাগে তুষ ও কিছু লিফলেট (আরবি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা) ছিল। লাগোয়া বাড়ির মালিক মুস্তাফিজুর রহমানের স্ত্রী আফিফা বিবি গোয়েন্দাদের জানান, শাকিলের বাড়ির বারান্দা ও ঘর বড় পর্দা দিয়ে সব সময়ে ঢাকা থাকত। কিছুই দেখা যেত না।
সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ বীরভূমের নানুরে পৌঁছয় এনআইএ-র তিন সদস্যের একটি দল। পুলিশের সঙ্গে তাদের বৈঠক চলার সময়েই সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা নাগাদ এসআইবি-র দুই অফিসার এসে পৌঁছন। রাত ৮টা নাগাদ এনআইএ-র দলটি বেরিয়ে বোলপুরের দিকে রওনা দেয়। পুলিশ সূত্রের খবর, গত শনিবার কদর গাজির বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া পোড়া কাগজপত্র, ডায়েরি-সহ বাজেয়াপ্ত করা জিনিসপত্র তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এসডিপিও (বোলপুর) সূর্যপ্রতাপ যাদবের কাছে তারা জেনারেটর, বাংলা জানা লোক আর পুলিশ বাহিনী চেয়েছে। রাতে উত্তরবঙ্গেও পৌঁছয় এনআইএ-র একটি দল। ধূপগুড়ি ও জয়গাঁয় তাদের যাওয়ার কথা বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
অন্য দিকে, নদিয়ার করিমপুর এলাকাতেও এক গ্রামীণ চিকিৎসকের খোঁজ শুরু করেছে সিআইডি। থানারপাড়াতেও তার খোঁজে হানা দেওয়া হয়। সিআইডি-র দাবি, ওই গ্রামীণ চিকিৎসকের সন্ধান পেলেই খাগড়াগড় বিস্ফোরণ সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসবে। এনআইএ-র তদন্তকারীদের কাছে ওই গ্রামীণ চিকিৎসকের নাম উঠে এসেছিল। তারাই সিআইডি-কে ওই চিকিৎসকের খোঁজ করতে বলেছে।


****************

ইংরেজবাজার

ধামাচাপা আর এক বিস্ফোরণ ফাঁস করল এনআইএ

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায় ও পীযূষ সাহা (সৌজন্য - আনন্দবাজার পত্রিকা)

কলকাতা ও মালদহ, ১৫ অক্টোবর, ২০১৪

মালদহের বৈষ্ণবনগরের বিস্ফোরণ নিয়ে দায়সারা পুলিশি তদন্তের অভিযোগ ইতিমধ্যে উঠেছে। এ বার জানা গেল, বৈষ্ণবনগরের আগে ইংরেজবাজারে সকেট বোমা বিস্ফোরণের একটি ঘটনাও পুরোপুরি চেপে গিয়েছে মালদহ জেলা পুলিশ!
তা প্রকাশ হল বর্ধমান-কাণ্ডে এনআইএ-র তদন্তের সূত্রেই। স্থানীয় সূত্রের দাবি, গত ৫ অক্টোবর ইংরেজবাজারে ওই বিস্ফোরণে তিন জন মারা যায়, গুরুতর আহত হয় তিন জন। মৃতদেহগুলো যেমন তড়িঘড়ি সরিয়ে ফেলা হয়, তেমন আহতদের কার্যত চুপিসাড়ে এনে ভর্তি করানো হয় কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে। যদিও নিজেদের সূত্র মারফত খবর পেয়ে পার্ক সার্কাসের সেই হাসপাতালে পৌঁছে গিয়েছে এনআইএ। তারা এখন জানার চেষ্টা করছে, খাগড়াগড়-কাণ্ডের সঙ্গে ইংরেজবাজারের কোনও যোগসূত্র আছে কি না। জেলা পুলিশ অবশ্য ইংরেজবাজারে বিস্ফোরণে প্রাণহানির কথা মানতে রাজি নয়। আবার হাসপাতালের দাবি, তিন জনকে পুলিশ প্রহরায় আনা হয়েছিল। অন্য দিকে পুলিশের দাবি, তারা হাসপাতাল থেকেই ওদের ভর্তি হওয়ার কথা জানতে পেরেছে।
আর এ সব চাপান-উতোরের মাঝেই ফাঁস হয়ে গিয়েছে যে, ইংরেজবাজারে বিস্ফোরণ একটা ঘটেছিল। কিন্তু এনআইএ কী ভাবে আহতদের খোঁজ পেল?
তদন্তকারী-সূত্রের খবর: এনআইএ-র কাছে খবর এসেছিল, বর্ধমান বিস্ফোরণে গুরুতর আহত তিন ব্যক্তি পার্ক সার্কাসের হাসপাতালটিতে ভর্তি রয়েছে। সেই মতো সোমবার রাতে এনআইএ-র লোকজন ওখানে পৌঁছে যান। দু’জনের ছবি তোলার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেন তদন্তকারীরা, চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্রের ছবিও তুলে নিয়ে যান। আর এক আহত আইসিসিইউয়ে থাকায় তার সঙ্গে অবশ্য এনআইএ কথা বলতে পারেনি। তবে আহতদের নিরাপত্তায় রাজ্য পুলিশ ও কড়েয়া থানার পুলিশের ‘ঢিলেমি’ কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের নজর এড়ায়নি।
মঙ্গলবার পার্ক সার্কাসের হাসপাতালটিতে গিয়ে জানা গেল, আহত তিন জন ইংরেজবাজার থানা-এলাকার বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা গ্রাম নরেন্দ্রপুরের বাসিন্দা। নাম উজের শেখ, আবদুল্লাহ শেখ ও জসিম শেখ। পাঁচ তারিখ বিকেল চারটে নাগাদ গ্রামের এক আমবাগানে সকেট বোমায় ওঁরা আহত হন। তাতে তিন জন নিহত হন বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করলেও পুলিশ মানতে নারাজ। পুলিশের বক্তব্য, ঘটনাস্থলে দেহ মেলেনি। তবে আমবাগান জুড়ে পোড়া গন্ধ ছিল, আহতেরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিলেন।
প্রসঙ্গত, গত ১২ অক্টোবর বৈষ্ণবনগরের বাজারতি গ্রামে এক সক্রিয় তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। এবং তাতেও পুলিশ দায়সারা তদন্ত করেছে বলে অভিযোগ। ইংরেজবাজার-কাণ্ড ফাঁস হওয়ার পরে বিরোধীদের প্রশ্ন, পুলিশ কি দুই ঘটনায় অভিযুক্তদের আড়াল করতে চাইছে? মালদহ জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নরেন্দ্রনাথ তিওয়ারির মন্তব্য, “মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু চৌধুরীই ইংরেজবাজারের কাণ্ড ধামাচাপা দিতে চাইছেন। পুুলিশ কোন সাহসে তদন্ত করবে?” সিপিএমের জেলা সম্পাদক অম্বর মিত্রের আক্ষেপ, “দলের একাংশ জড়িয়ে পড়েছে দেখে মন্ত্রী নীরব ভূমিকা পালন করছেন।” বিজেপি’র জেলা সাধারণ সম্পাদক অজয় গঙ্গোপাধ্যায়ের দাবি, “তৃণমূল কর্মীরা জড়িয়ে পড়ছে বলেই মন্ত্রী পরিকল্পিত ভাবে নীরব।”
স্থানীয় বিধায়ক তথা মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দুবাবু অবশ্য অভিযোগ মানতে নারাজ। “পুলিশ পুলিশের কাজ করছে। আমি এসপি’কে বলেছি আইনের শাসন বলবৎ করতে হবে।” জানিয়েছেন তিনি। পুলিশের ভূমিকা কি প্রশ্নাতীত?
মালদহের পুলিশ সুপার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার দাবি করেছেন, কাউকে আড়াল করতে কিংবা তথ্য-প্রমাণ লোপাট করতে পুলিশ কাউকে সাহায্য করছে না। “জখম তিন জনের চিকিৎসা চলছে কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে। সুস্থ হয়ে উঠলেই তাদের গ্রেফতার করে আদালতে তোলা হবে।” বলেছেন এসপি। বৈষ্ণবনগর প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, “ওখানে এক জনকে ধরা হয়েছে। মূল অভিযুক্ত কামাল শেখ ও তার ভাইদের খোঁজে তল্লাশি চলছে।”
ইংরেজবাজারে ঠিক কী হয়েছিল?
পুলিশের দাবি: দুষ্কৃতীরা মাচায় বসে বোমা বাঁধছিল, তখন বিস্ফোরণ হয়। অন্য দিকে আহতেরা এ দিন হাসপাতালের বেডে শুয়ে দাবি করেছেন, ওঁরা আমবাগানে যখন তাস খেলছিলেন, তখন মুখে গামছা বাঁধা তিন জন মোটরবাইকে চেপে এসে বোমা ছুড়ে চম্পট দেয়। এনআইএ-কেও তাঁরা একই কথা বলেছেন। উজের শেখের চোখে স্প্লিন্টার ঢুকে গিয়েছে। বুক-হাত-পা ক্ষতবিক্ষত। জানালেন, “আমি লরি ড্রাইভার। সরকারি মাল নিয়ে বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করি। শেষ বার ঈদের সময়ে গিয়েছিলাম। বোমা বাঁধতে যাব কেন?” কিন্তু খামোখা তাঁদের কেউ বোমাই বা মারবে কেন? উজেরের জবাব, “তা জানি না। আমার কোনও শত্রু নেই। সৎ ভাবে রোজগার করি।”
আবদুল্লাও গাড়িচালক। তাঁরও চোখ মারাত্মক জখম। এ দিন চোখে অস্ত্রোপচার হওয়ায় তিনি কথা বলতে পারেননি। অবস্থা সবচেয়ে খারাপ জসিম শেখের। সারা শরীরে অসংখ্য আঘাত। জ্ঞান নেই, আপাতত ভেন্টিলেশনে। পুলিশ-সূত্রের খবর, প্রথমে তিন জনকেই মালদহ শহরের এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ৭ তারিখে উজের ও জসিমকে কলকাতায় আনা হয়। ১০ তারিখে আনা হয় জসিমকে। মালদহ পুলিশের দাবি, তারা হাসপাতাল থেকেই তিন জনের ভর্তি হওয়ার খবর জানতে পেরেছে।
কিন্তু পুলিশের চোখ এড়িয়ে এমন মারাত্মক আহত তিন জন কলকাতায় পৌঁছল কী ভাবে?
এ প্রশ্নের ব্যাখ্যা মেলেনি।

**************

এ বার লালগোলা

পোড়া কাগজ পড়ে, উধাও প্রতিষ্ঠাতা

অনল আবেদিন ও বিমান হাজরা (সৌজন্য - আনন্দবাজার পত্রিকা)

লালগোলা, ১৫ অক্টোবর, ২০১৪, 

নোটিসটা ঈদের ছুটির। ছুটি ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত। তার পর দিন হাজির না হলে ৫০ টাকা জরিমানা। তার পরেও গরহাজির থাকলে প্রতিদিন জরিমানা ১০ টাকা করে। কিন্তু মুর্শিদাবাদের লালগোলার মকিমনগরের এক অননুমোদিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই নোটিস যিনি দিয়েছেন, সেই মোফাজ্জুল শেখ কবে আবার সেখানে হাজির হবেন বা আদৌ হাজির হবেন কি না তা নিয়েই ধন্দ দেখা দিয়েছে। কারণ, খাগড়াগড় বিস্ফোরণ-কাণ্ডে অভিযুক্ত আব্দুল হাকিম, রাজিয়াবিবি, আলিমাবিবির সূত্রে মঙ্গলকোটের শিমুলিয়া মাদ্রাসা ছাড়াও জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (এনআইএ) রেডারে রয়েছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিস্ফোরণ-কাণ্ডের পরে সপরিবার এলাকাছাড়া ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা মোফাজ্জুল।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, ২০০৮ সালে মকিমনগরে ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন স্থানীয় বাসিন্দা পাট-আলু-ডিমের ব্যবসায়ী তথা রাজমিস্ত্রির ঠিকাদার মোফাজ্জুল। খাগড়াগড় বিস্ফোরণ হয় ২ অক্টোবর। ৭ অক্টোবর থেকে তিনি সপরিবার নিখোঁজ। তবে বিস্ফোরণ-কাণ্ডে ধৃত রাজিয়া, আলিমা ও হাকিমের ছবি সংবাদমাধ্যমে দেখে চমকে উঠেছিলেন এলাকাবাসী। সাত-আট মাস আগেও হাকিমকে ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রান্না করতে দেখেছেন তাঁরা। সেই সুবাদেই সেখানে যাতায়াত ছিল রাজিয়া-আলিমার।
মঙ্গলবার ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা গেল, ভবনটির দু’টি অংশ। একটিতে ঢালাই ছাদ রয়েছে। আর একটি ইটের গাঁথনি দেওয়া, ছাদ টিনের। অফিসঘর তালাবন্ধ। বাইরের দিকে শুধু একটি জানলা খোলা। দু’টি স্নানাগার ও সাতটি শৌচাগার রয়েছে। শৌচাগারের একটিতে পড়ে রয়েছে কিছু পোড়া কাগজ। এতটাই পুড়েছে যে, তা থেকে কিছু উদ্ধার করা কার্যত অসম্ভব। ১৪টি ঘরের একটিতে পড়ে আছে বেশ কয়েকটি ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ। আর একটিতে দেখা গিয়েছে একটি সিম-কার্ড। ভাঙা। রান্নাঘরের পাশের ঘরে একটি সাইকেল ও দু’টি মোটরবাইক, একটি মোটরবাইকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর অন্য জেলার। প্রতিটি ঘরেই রাখা রয়েছে ট্রাঙ্ক। এবং সেগুলোর বেশিরভাগই তালাবন্ধ। কিছু খোলা ট্রাঙ্কে রয়েছে বই ও জামাকাপড়। রান্নাঘরে দু’টি বড় কাঠের উনুন, একটি গ্যাস সিলিন্ডার। আর আছে চাল, নুন ও লঙ্কাগুঁড়ো।
এক গোয়েন্দা-কর্তার কথায়, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শৌচাগারে যে পোড়া কাগজ মিলেছে, তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। আমাদের অনুমান, আপত্তিকর কোনও নথি পোড়ানো হয়েছে।” মোফাজ্জুলের খোঁজ চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এলাকাটি বাংলাদেশের গোদাগাড়ি উপজেলা থেকে বড়জোর ৯ কিলোমিটার দূরে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নেই। স্থানীয় সূত্রের খবর, প্রথম দিকে নদিয়ার দেবগ্রামে নিজের শ্বশুরবাড়িতে থেকে লোহার ব্যবসা করতেন মোফাজ্জুল। বছর দশেক আগে গ্রামে ফিরে তিনি ঠিকাদারির পাশাপাশি ডিম, আলু ও পাটের কারবার শুরু করেন। ২০০৮ সালে মকিমনগরে নিজের বাড়িতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি চালু করেন। ২০১১ নাগাদ তিনশো মিটার দূরে মাঠের মধ্যে ১২ কাঠা জমি কিনে বাড়ি তৈরি করে সেখানে পড়ানোর বন্দোবস্ত করেন তিনি। শুরু থেকেই এখানে শুধু ছাত্রীরা পড়ত। প্রথম দিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে দু’-এক জন পুরুষ শিক্ষক থাকলেও পরবর্তী কালে শিক্ষিকারাই পড়াতেন। ১৩০ জন ছাত্রী বর্তমানে সেখানে পড়াশোনা করে। অর্ধেকের বেশি পড়ুয়া আবাসিক। জেলা ও জেলার বাইরে থেকে আসা ছাত্রীরাও রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টিউশন ফি মাসে দেড়শো টাকা। আবাসিকদের প্রতি মাসে আরও ৪০০ টাকা করে বেশি দিতে হয়। প্রতিটি ক্লাসঘরে পাখা, আলো ও ঘড়ির ব্যবস্থা থাকলেও বসার কোনও বেঞ্চ বা চেয়ার নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ছাদে চার দিকে প্রাচীর অন্তত পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ ফুট উঁচু। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, ছাদে কী হচ্ছে।
এনআইএ সূত্রের দাবি, হাকিম-রাজিয়াদের জেরা করে তারা জেনেছে, শিমুলিয়ার মতো পড়ুয়াদের জেহাদি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করা বা জঙ্গি-প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো এখানে। এমনকী, ভিন্ দেশ থেকে আসা লোকও  ‘মগজ ধোলাই’-এর কাজে আসত বলে সন্দেহ করছেন গোয়েন্দারা।
বিস্ফোরণের তদন্তে নাম উঠে আসায় গত ৯ অক্টোবর ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যান পুলিশ ও গোয়েন্দারা। কিন্তু মোফাজ্জুলকে পাননি। স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশকে জানিয়েছেন, পরিবারটি কোথায় তাঁরা জানেন না। পুলিশ সূত্রের দাবি, মোফাজ্জুলের গোটা তিনেক মোবাইল নম্বর রয়েছে। তার একটিতে ফোন করে তাঁকে ওই প্রতিষ্ঠানে ডাকে পুলিশ। তিনি সেখানে আসার প্রতিশ্রুতিও দেন। কিন্তু আসেননি। তার পর থেকে তাঁর ওই নম্বরের মোবাইলটি বন্ধ। অন্য যে দু’টি নম্বর রয়েছে, সেগুলিতে ডায়াল করলে কেউ ফোন ধরছে না।
মোফাজ্জুলের সঙ্গে তাঁদের বিশেষ বনিবনা হত না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে। এলাকার একাধিক বাসিন্দা বলেছেন, “এই প্রতিষ্ঠানে মাঝেমধ্যে কিছু পুরুষ আসতেন, তাঁদের বিবিরা সেখানে লেখাপড়া করেন, এই পরিচয় দিয়ে।” তাঁদের একটা বড় অংশের সংযোজন, “টিভিতে হাকিম, আলিমা ও রাজিয়াকে দেখে চমকে উঠেছিলাম। ওদের সবাইকেই তো চিনি। ভেবেছিলাম, মোফাজ্জুলের কাছে কী হয়েছে জানতে চাইব। কিন্তু ও তো সপরিবার নিখোঁজ!”

আরও পড়ুন - কাদের স্বার্থে বর্ধমান এস পি বিস্ফোরণের প্রমাণ নষ্ট করল এবং ভুল রিপোর্ট দিয়ে তদন্ত ভুলপথে চালিত করতে চাইলেন কাকে বাঁচাতে?