Showing posts with label Bangladesh. Show all posts
Showing posts with label Bangladesh. Show all posts

Saturday, October 25, 2014

Burdwan Blast - Jamat of Bangla involved


ধৃতরা জামাতের লোক, বলল এনআইএ

নিজস্ব প্রতিবেদন

২৫ অক্টোবর, ২০১৪, 


2

শাকিলের বোরখা কারখানায় তদন্তে এনআইএ-র ডিজি শরদ কুমার। ছবি: গৌতম প্রামাণিক।

বোমা বানাতে গিয়ে একটি বিস্ফোরণে দু’জন নিহত এবং এক জন আহত— এক কথায় বলতে গেলে খাগড়াগড়ের ঘটনার নির্যাস এটুকুই। কিন্তু শুক্রবার সেই খাগড়াগড়েই সটান চলে এলেন খাস এনআইএ-র ডিজি শরদ কুমার। কারণ আর কিছুই নয়, এনআইএ সূত্রেই বলা হচ্ছে, ডিজি নেহাত একটি বিস্ফোরণস্থল দেখতে আসেননি। এসেছেন এমন জায়গায়, যেখান থেকে  ভিন দেশেও নাশকতা ঘটানোর প্রস্তুতি চলছিল।
শুক্রবার, ডিজি-র সফরের দিনই সন্ধেবেলা এনআইএ তার প্রেস বিবৃতিতে এই প্রথম খোলাখুলি জানিয়ে দিল— প্রাথমিক তদন্তে প্রকাশ, খাগড়াগড়ে অভিযুক্ত এবং তাদের সহকারীরা সকলেই বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাত উল মুজাহিদিনের (জেএমবি) সদস্য। এর মধ্যে রাজিয়া বিবি, আলিমা বিবি, বদর-এ আলম ওরফে হাসেম মোল্লা এবং আব্দুল হাকিম ইতিমধ্যেই ধরা পড়েছে। তারা এখানে বসে বাংলাদেশে পাচার করার জন্য আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বানানোর কাজে যুক্ত ছিল। এনআইএ জানিয়েছে, তারা জেএমবি-র কাজকর্মের হদিস পেতে তদন্তে সম্ভাব্য সব ক’টি দিকই খতিয়ে দেখবে। জেএমবি-র পিছনে আর্থিক মদতের উৎসও চিহ্নিত করা হবে।
খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণ হয় ২ অক্টোবর। ১১ অক্টোবর এনআইএ তদন্তে নামে। এনআইএ সূত্রের খবর, খাগড়াগড়ে হাসান চৌধুরীর বাড়ির দোতলায় সন্ত্রাসবাদীরা বিস্ফোরক, আইইডি ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র তৈরির পুরোদস্তুর একটি গবেষণাগার গড়ে তুলেছিল। এই গবেষণাগারই এ দিন স্বচক্ষে দেখতে এসেছিলেন ডিজি। খাগড়াগড়ের ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে বাদশাহি রোডের একটি বাড়িতে গত ১৬ অক্টোবর এনএসজি (ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড) তল্লাশি চালিয়ে ৩৫টি হ্যান্ড গ্রেনেড ও চারটি সকেট বোমা উদ্ধার করেছিল। খাগড়াগড় থেকে ডিজি এ দিন যান বাদশাহি রোডের বাড়িতেও। খাগড়াগড়ের মতোই আরও একটি গবেষণাগারের হদিস মিলেছিল মুশির্দাবাদের বেলডাঙাতেও। যে কারণে বর্ধমান থেকে ডিজি হেলিকপ্টারে চলে যান বহরমপুরে এবং সেখান থেকে গাড়িতে পৌঁছন বেলডাঙায়। এনআইএ-র এক তদন্তকারী অফিসারের কথায়, “আমাদের ডিজি তিন রকম তিনটি জায়গায় গেলেন। একটি, বিস্ফোরক ও আইইডি-র গবেষণাগার। দ্বিতীয়টি, আইইডি মজুত রাখার জায়গা। তৃতীয়টি খাগড়াগড়ের আগে যেখানে গবেষণাগার ছিল, সেই জায়গা।”
শুক্রবার সকালে বর্ধমানের সাই
কমপ্লেক্সে পৌঁছলেন এনআইএ-র
ডিজি শরদ কুমার। নিজস্ব চিত্র।
তদন্ত সেরে কলকাতা ফিরছেন এনআইএ-র
ডিজি শরদ কুমার। বহরমপুরে
গৌতম প্রামাণিকের ছবি।
এ দিন বেলা পৌনে ১১টা নাগাদ বিএসএফের হেলিকপ্টারে বর্ধমানের নবাবহাটে স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (সাই)-এর মাঠে নামেন ডিজি। সঙ্গে ছিলেন এনআইএ-র আইজি সঞ্জীব সিংহ এবং খাগড়াগড় কাণ্ডের তদন্তকারী অফিসার বিক্রম খালাটে। নবাবহাট থেকে সোজা তাঁরা চলে আসেন খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণস্থলে। দোতলা বাড়িটি খুঁটিয়ে দেখেন এনআইএ-র সর্বোচ্চ কর্তা। ওই বাড়ির মধ্যেই এখনও বেশ কিছু জিনিস রাখা হয়েছে। বাড়িতে ঢোকার মুখে ডিজিকে তৃণমূলের অস্থায়ী পার্টি অফিসটিও দেখান অন্য অফিসারেরা। ডিজি-সহ এনআইএ-র কর্তারা বাড়ির ছাদেও ওঠেন। মিনিট পনেরো ওই বাড়িতে কাটিয়ে ডিজি জানান, তিনি বাদশাহি রোডে রেজাউল করিমের বাড়িটি দেখতে চান। নইলে বাদশাহি রোডে যাওয়া হবে বলে আগে থেকে জেলা পুলিশও জানত না।
এর আগে ১১ অক্টোবর এনআইএ-র তদন্তকারী দল যে দিন বর্ধমানে তদন্তে গিয়েছিল, সে দিন জেলা পুলিশকে সঙ্গে নিয়েই এলাকা পরিদর্শন করেছিল তারা। এ দিন কিন্তু এনআইএ-র দলের সঙ্গে বর্ধমান থানা আইসি আব্দুল গফফর ছাড়া জেলা পুলিশ বা সিআইডি-র আর কেউ ছিলেন না। হেলিপ্যাডে ডিজিকে স্বাগত এবং বিদায় জানাতে অবশ্য পুলিশ সুপার এসএমএইচ মির্জা উপস্থিত ছিলেন। তা ছাড়া হেলিকপ্টার পাহারা এবং ডিজি-র নিরাপত্তার জন্য এ দিন বিএসএফের এক দল জওয়ানের বর্ধমানে আসার কথা ছিল। সেই মতো মালদহ থেকে এ দিন ভোরে জওয়ানরা রওনাও দিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ে পৌঁছতে পারেনি। বীরভূম থেকেই তাঁরা ফিরে যান। ডিজি-র হেলিকপ্টার পাহারায় জেলা পুলিশই বহাল ছিল।
এ দিন খাগড়াগড়েও এলাকা কর্ডন করে কড়া পুলিশি ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। পুরো এলাকায় এনআইএ-র তদন্তকারী এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা ছাড়া তাই আর কাউকে দেখা যায়নি। ডিজি বেরিয়ে যাওয়ার পর খাগড়াগড়ের বাসিন্দারা বেরিয়ে এসে পুলিশি বাড়াবাড়ি এবং লাগাতার তদন্তের জেরে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে বলে ক্ষোভ উগরে দেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদেরও এলাকাবাসীর বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। বাদশাহি রোডে রেজাউলের বাড়িতে মিনিট কয়েক কাটিয়ে ডিজি ফিরে যান নবাবহাটের হেলিপ্যাডে। মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে রওনা হন তাঁরা। বেলা ১২ টা ৫৫ মিনিটে বহরমপুর সার্কিট হাউস থেকে তাঁর কনভয় রওনা দেয় বেলডাঙার উদ্দেশে। দুপুর সওয়া ১টা নাগাদ তিনি পৌঁছন বেলডাঙায়। বড়ুয়া পাওয়ার হাউসপাড়ায় শাকিলের ভাড়া করা ওলিওল ইসলামের বাড়িতে প্রায় ১৫ মিনিট ছিলেন ডিজি। সেখান থেকে তিনি চলে যান ফারাজিপাড়ায় বোরখা তৈরির কারখানায়, ছিলেন মিনিট পাঁচেক। শিশু মাদ্রাসা বাজারে শাকিলের দোকান ‘বোরখা ঘরে’ ডিজি নামেননি। গাড়ি থেকেই দেখে নেন ডেরাটি।
দুপুর সওয়া ২ টো নাগাদ কনভয়ের মুখ ঘুরে যায় বহরমপুরের দিকে। ২টো ৪০ মিনিটে বহরমপুর সার্কিট হাউসে ফিরেই শরদ কুমার বৈঠকে বসেন বিএসএফ-এর ডিআইজি এবং মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপারের সঙ্গে। সূত্রের খবর, ডিআইজি জিতেন্দ্র কুমার রদলা এবং এসপি সি সুধাকরের কাছে সীমান্ত এলাকার অপরাধ নিয়ে খবরাখবর নেন ডিজি। অনুপ্রবেশ, জাল নোটের কারবার, জাল নথি দিয়ে পাসপোর্ট তৈরির চক্র নিয়ে তিনি বিশদ তথ্য চান। সেই সঙ্গে সীমান্তের কতটুকু অংশে কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে, কোথায় নেই, সে সব নিয়েও আলোচনা হয়। বিকেল ৩টে ৫ মিনিট নাগাদ তাঁর কপ্টার উড়ে যায় কলকাতার উদ্দেশে।
বিকেলে কলকাতায় ফিরে সল্টলেকের সিআরপি অতিথি নিবাসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শরদ কুমার বলেন, “তদন্ত পর্যালোচনা করার জন্য আমি কলকাতায় এসেছি। মুর্শিদাবাদ ও বর্ধমানে গিয়েছি। এই মামলায় যারা পলাতক, তাদের গ্রেফতার করার জন্য আমরা কিছু কৌশল বার করেছি।” পলাতকদের হদিস দিলে আর্থিক পুরস্কার ঘোষণার ব্যাপারে ভাবনাচিন্তা করছে এনআইএ। শীঘ্রই এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য এনআইএ-র ওয়োবসাইটে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। খাগড়াগড় বিস্ফোরণের সঙ্গে তেলেঙ্গানার করিমনগরে গত ফেব্রুয়ারি মাসের একটি ব্যাঙ্ক ডাকাতির যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে এনআইএ। ওই ডাকাতির টাকার একাংশ খাগড়াগড়ের জঙ্গিদের কাছে পৌঁছেছিল বলে তদন্তকারীদের একাংশের ধারণা। কারণ ওই ডাকাতিতে জড়িতরা জেল পালানো সিমি সদস্য বলে সন্দেহ। তা ছাড়া খাগড়াগড়ে উদ্ধার টাকার বান্ডিলে করিমনগরের ব্যাঙ্কের ছাপ মিলেছে বলে খবর। এ দিন এনআইএ-র ডিজিকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বলেন, “আমি এ ব্যাপারে কিছু বলব না। কারণ, তাতে তদন্ত প্রভাবিত হবে।” সন্ধেয় সিআরপি-র অতিথিনিবাসে এনআইএ-র অফিসারদের সঙ্গে ফের আলোচনায় বসেন ডিজি। সূত্রের খবর, খাগড়াগড় তদন্তের গতিপ্রকৃতি ছাড়াও এ রাজ্যে এনআইএ-র স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির ব্যাপারেও এ দিন আলোচনা হয়েছে।

আসছেন ডোভাল
এনআইএ-র ডিজির পরে রাজ্যে আসছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। আগামী সোমবার তাঁর আসার কথা। সূত্রের খবর, তৃণমূল সাংসদ আহমেদ হাসান ইমরানের জামাত-যোগ এবং সারদার টাকা বাংলাদেশে যাওয়ার অভিযোগ নিয়ে যে সব তথ্য ঢাকা দিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তা নিয়ে আলোচনা করতে চান ডোভাল। কেন্দ্রীয় সরকারি সূত্রে বলা হচ্ছে, পড়শি দেশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মুখ্যমন্ত্রীকে জানাতেই আসছেন ডোভাল। তিনি খাগড়াগড় কাণ্ডের তদন্তের অগ্রগতি জানতে বর্ধমানেও যেতে পারেন।
*****************

হাকিমকে কত দিনে হেফাজতে পাবেন, ধন্দে এনআইএ কর্তারা

নিজস্ব সংবাদদাতা

কলকাতা, ২৫ অক্টোবর, ২০১৪, 



বাঁ পায়ে একটি ক্ষত। সেখানে স্প্লিন্টার ঢুকেছিল। তিন সপ্তাহ কেটে গেল, শুকোনোর নাম নেই। আহত ব্যক্তি অবশ্য গোড়া থেকেই হাসপাতালে। প্রথম সাত দিন বর্ধমানে, তার পরে কলকাতায়। খাগড়াগড় বিস্ফোরণের একমাত্র জীবিত প্রত্যক্ষদর্শী সেই আবদুল হাকিমকে শেষমেশ কবে নাগাদ হেফাজতে নিয়ে জেরা করতে পারবে এনআইএ?
শুক্রবার জাতীয় তদন্ত সংস্থার খোদ শীর্ষ কর্তার উপস্থিতিতে আয়োজিত তাবড় অফিসারদের বৈঠকে ঘুরে-ফিরে উঠে এল সেই প্রশ্ন।
পশ্চিমবঙ্গে সফররত এনআইএ’র ডিজি শরদ কুমার এ দিন বিকেলে সল্টলেকে সিআরপি’র অতিথিনিবাসে বৈঠকে বসেছিলেন। এজেন্সির তদন্তকারীরা তাঁর সামনেই হাকিম-প্রসঙ্গে আলোচনা করেন। বছর তেইশের যুবকটিকে ৯ অক্টোবর বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ থেকে এনে এসএসকেএমে ভর্তি করা হয়েছে। এনআইএ-সূত্রের খবর, হাকিমের ক্ষতস্থানে আগামী সোমবার ফের স্কিন গ্রাফটিং (শরীরের অন্য জায়গার চামড়া কেটে লাগানো) হবে। সে ক্ষেত্রে আরও সপ্তাহখানেকের আগে তাকে হেফাজতে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই ডিজি-কে জানিয়েছেন অফিসারেরা।
এবং এত দিন ধরে হাকিমের হাসপাতালে থাকাটা তাঁদের কাছে যে খুব স্বাভাবিক ঠেকছে না, তেমন ইঙ্গিতও কোনও কোনও অফিসার ডিজি-কে দিয়েছেন বলে এজেন্সি-সূত্রে জানা গিয়েছে। এনআইএ’র বক্তব্য: হাকিমকে এসএসকেএমের কেবিনে কয়েক দফায় যেটুকু জেরা করা গিয়েছে, তাতে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। বীরভূমের মহম্মদবাজারের দেউচা গ্রামের বাসিন্দাটি নিজেকে জমিয়ত-উল-মুজাহিদিনের সদস্য হিসেবে দাবি করে জানিয়েছে, তিন বছর ধরে সে জঙ্গি কার্যকলাপে লিপ্ত। বর্ধমানের স্থানীয় কিছু তৃণমূল নেতার সঙ্গে খাগড়াগড়-কাণ্ডের কুশীলবদের নিয়মিত যোগাযোগের কথা সে স্বীকার করেছে। পাশাপাশি ভারত ও বাংলাদেশের নানা শহরে একযোগে ধারাবাহিক নাশকতার ছক সম্পর্কেও হাকিমের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে বলে গোয়েন্দাদের দাবি।
সন্ত্রাস-যজ্ঞের এ হেন চক্রীকে হাতে পাওয়া নিয়ে এনআইএ’র মনে প্রশ্ন জেগেছে কেন?
কারণ, গত কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা। ১১ অক্টোবর এসএসকেএমে হাকিমের পা থেকে স্প্লিন্টার বার করা হয়। হাসপাতালের এক কর্তা ও হাকিমের স্বাস্থ্যে নিয়মিত নজরদার চিকিৎসকদের এক জন ১৫ তারিখে জানিয়েছিলেন, পর দিনই হাকিমকে ছেড়ে দেওয়া হবে। “এমন লোককে হাসপাতালে রাখাটা বেশ ঝুঁকির। রোগীদের তো বটেই, আমাদের পক্ষেও।”— মন্তব্য করেছিলেন তিনি। এ-ও বলেন, “আমরা ১৪ তারিখেই হাকিমকে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এনআইএ বলেছে, প্রস্তুতির জন্য ওদের একটা দিন দরকার। তাই সিদ্ধান্ত হয়েছে, ১৬ তারিখে ছাড়া হবে।” এসএসকেএমের কর্তাটি সে দিন জানিয়েছিলেন, স্প্লিন্টার বার করার পরে চার দিন বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে। রোগীকে আর হাসপাতালে ভর্তি রাখার প্রয়োজন নেই। শুধু নিয়মিত ড্রেসিং দরকার।
কিন্তু রাতারাতি মত বদলে যায়।
১৬ তারিখ সকালে হাকিমকে হেফাজতে নেওয়ার জন্য হাসপাতালে গিয়ে এনআইএ’র অফিসারেরা জানতে পারেন, তার ক্ষতস্থানের সিটি স্ক্যান-সহ বিবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। বেলা বারোটা নাগাদ হাসপাতালের তরফে ওঁদের জানানো হয়, হাকিমকে ছাড়া যাবে না, কারণ সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট আসেনি। অফিসারেরা তার পরেও অপেক্ষা করেছিলেন। বিকেলে তাঁদের বলা হয়, পর দিন, অর্থাৎ ১৭ অক্টোবর হাকিমের স্কিন গ্রাফটিং হবে। ১৭ তারিখ গ্রাফটিংয়ের পরে এসএসকেএম-সূত্রে বলা হয়, কালীপুজোর এক দিন আগে বা পরে হাকিমকে ছাড়া হবে।
এরই মধ্যে ২২ তারিখে খাগড়াগড়-কাণ্ডের মামলা শুনানির জন্য ওঠে। এনআইএ কোর্টকে জানায়, এসএসকেএম-কর্তৃপক্ষ হাকিমের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে এক-এক সময়ে এক-এক রকম কথা বলায় তদন্ত-পরিকল্পনা ছকতে সমস্যা হচ্ছে। কলকাতার নগর দায়রা আদালতের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বিচারক এসএসকেএম-কর্তৃপক্ষকে সে দিন নির্দেশ দেন, ৩১ অক্টোবরের মধ্যে হাকিমের শারীরিক অবস্থা সংক্রান্ত বিস্তারিত রিপোর্ট আদালতে পেশ করতে হবে। এবং সে দিন রাতেই এসএসকেএম থেকে লিখিত ভাবে এনআইএ-কে জানানো হয়, হাকিমের ক্ষতস্থান শুকোচ্ছে না। গ্রাফটিং সফল হয়নি। তাই ২৭ অক্টোবর ফের গ্রাফটিং হবে।
হাকিমের শারীরিক অবস্থা ঠিক কী রকম? এসএসকেএমের সেই কর্তাটিই এ দিন বলেন, “কিচ্ছু বলা যাবে না। মুখ খোলা বারণ।” আর এক কর্তার মন্তব্য, “হাকিমের ব্যাপারে এমনিতেই চাপে রয়েছি। ওকে ছাড়ার কথা বলে বাড়তি চাপ নিতে চাই না।” হাকিমকে না-ছাড়ার জন্য কারা চাপ দিচ্ছেন জানতে চাইলে কর্তাটি এড়িয়ে যান।
খাগড়াগড়-কাণ্ডে বর্ধমানের পুলিশ সুপার সৈয়দ মহম্মদ হোসেন মির্জার প্রাথমিক রিপোর্টেই বলা ছিল, ২ অক্টোবর বিস্ফোরণের কিছুক্ষণ বাদে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে, হাকিম জখম অবস্থাতেই স্ত্রী আলিমা বিবির সঙ্গে মিলে কিছু কাগজপত্র, মোবাইল ও সিমকার্ড আগুনে ফেলে দিচ্ছে। সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ ও জঙ্গি-যোগের প্রমাণ নষ্ট করাই ওদের মতলব ছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন এসপি। ৩ অক্টোবরে পাঠানো রিপোর্টটি গিয়েছিল সিআইডি-র এডিজি রামফল পওয়ারের কাছেও। ৩ অক্টোবর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডি-র হাতেই ন্যস্ত ছিল খাগড়াগড়ের তদন্তভার। অথচ ওই আট দিনে সিআইডি একটি বারও হাকিমকে জেরা করেনি! কেন? সিআইডি-র এক অফিসারের ব্যাখ্যা, “ভেবেছিলাম, ও তো হাসপাতালে আছে, সুস্থ হলে জেরা করা যাবে। আমরা তল্লাশি অভিযান আর ধৃত দুই মহিলাকে (রাজিয়া-আলিমা) জেরায় জোর দিয়েছিলাম।’’ অন্য দিকে এনআইএ জানাচ্ছে, হাসপাতালে হাকিমকে অল্প জেরা করেই তদন্ত বিস্তর এগিয়েছে। “হেফাজতে নিলে ওকে দীর্ঘ সময় ধরে জেরা করা যাবে। জঙ্গি চাঁইদের অনেকের ছবি দেখানো যাবে, বাজেয়াপ্ত কিছু নথি সম্পর্কেও সে তথ্য দিতে পারে। এ সব হাসপাতালে সম্ভব নয়।”— বলছেন এনআইএ-র এক অফিসার। সে জন্য ওঁদের এ ভাবে অপেক্ষায় রাখা হচ্ছে কেন?
এসএসকেএমের অধিকর্তা প্রদীপ মিত্রের বক্তব্য, হাকিমের পায়ের ক্ষতটাই গোড়া থেকে সমস্যায় ফেলেছে। হাসপাতালে ওর চিকিৎসার জন্য তৈরি মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যেরা তার শরীরে অন্য সমস্যা খুঁজে পাননি। প্রদীপবাবুর কথায়, “ক্ষতস্থান না-শুকোনোয় গ্রাফটিংয়ের সিদ্ধান্ত হয়। এ সব ক্ষেত্রে তা-ই হয়। কিন্তু হাকিমের গ্রাফটিং সফল হয়নি। এমন নজিরও বহু রয়েছে। সবই আদালতকে জানানো হবে।”
চিকিৎসকেরা জানান, সোমবার ফের গ্রাফটিংয়ের পরে অন্তত এক সপ্তাহ হাকিমকে হাসপাতালে থাকতে হবে। তার পরে ওকে হাসপাতালে রাখার কোনও কারণ নেই। বস্তুত বেশি দিন রাখা হলে হাসপাতাল থেকেই হাকিমের সংক্রমণ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কায় ডাক্তারদের কেউ কেউ। তাঁদের মতে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাকিমকে ছুটি দেওয়াই শ্রেয়।
হাকিমের দ্রুত হাসপাতাল-মুক্তি সম্পর্কে এনআইএ তবু সংশয়ে। ওদের সংশয় অমূলক কি না, আগামী সপ্তাহেই পরিষ্কার হবে।

***************

জহিরুলের খোঁজ পেলে থানায় জানান: ইমাম

গৌরব বিশ্বাস ও কল্লোল প্রামাণিক

থানারপাড়া, ২৫ অক্টোবর, ২০১৪, 

5

এই মসজিদেই জহিরুল সম্পর্কে ঘোষণা করা হয়। —নিজস্ব চিত্র।

সন্ত্রাসে জড়ায়নি গ্রাম। নাম জড়িয়েছে গ্রামের বাসিন্দা এক যুবকের। কিন্তু এলাকা ছেড়ে বেরোলেই খাগড়াগড়-কাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে উড়ে আসা আলটপকা মন্তব্য, বাঁকা চাউনি আর ফিসফাস—কমবেশি এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে নদিয়ার থানারপাড়ার গমাখালি গ্রাম আর লাগোয়া এলাকার অনেক বাসিন্দার। সেই পরিস্থিতিতে দাঁড়ি টানতে এগিয়ে এল এক মসজিদ। শুক্রবার নমাজ পড়ার আগে ‘থানারপাড়া দহপাড়া জুম্মা মসজিদ’-এর ইমাম নমাজ পড়তে আসা বাসিন্দাদের অনুরোধ করলেন জঙ্গি কার্যকলাপে নাম জড়ানো গমাখালি গ্রামের জহিরুল শেখের খোঁজ পেলে মসজিদ কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ-প্রশাসনকে সে খবর জানাতে।
ইমাম জাবের আলির কথায়, “জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস—শুধু ইসলাম নয়, পৃথিবীর কোনও ধর্ম সমর্থন করে না। এক জনের জন্য গোটা এলাকার বদনাম আমরা সহ্য করব না।”
২ অক্টোবর বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণে হত শাকিল আহমেদের স্ত্রী রাজিয়া বিবির এক আত্মীয়কে জিজ্ঞাসাবাদ করে জহিরুলের নাম পান গোয়েন্দারা। গমাখালিতে তার বাড়ি থেকে ১০ অক্টোবর ৪১টি জিলেটিন স্টিক উদ্ধার করে সিআইডি। জহিরুল ৭ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ। অথচ, তার খোঁজে গমাখালিতে পুলিশ-গোয়েন্দাদের যাতায়াত লেগেই রয়েছে। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (এনআইএ) গোয়েন্দারাও সোমবার ঘুরে এসেছেন সেখান থেকে।
মসজিদ কমিটির সভাপতি সেলিম রেজা বলেন, “খাগড়াগড়-কাণ্ডে জহিরুলের নাম জড়িয়েছে শুনে আমরা চমকে উঠেছিলাম। কারণ, যখন এলাকায় ছিল ওর রকমসকম দেখে কারও সন্দেহ হয়নি।” স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, জহিরুল বেপাত্তা হয়ে যাওয়ার পর থেকে নানা মহলের সন্দেহ বাড়তে থাকে। তবে সে সন্দেহ শুধু জহিরুল বা তার পরিবারের উপরেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার একাধিক বাসিন্দার কথায়, “ট্রেনে-বাসে হয়তো এলাকার কয়েক জন এক সঙ্গে গল্প করতে করতে যাচ্ছি। সহযাত্রীদের কেউ জানতে চাইলেন ‘বাড়ি কোথায়’? জবাব শুনে অনেকেরই দৃষ্টিটা যেন কেমন বদলে গেল! কেউ-কেউ উল্টোপাল্টা দু’-একটা কথাও শুনিয়ে দিল।” গোটা ব্যাপারটাই অস্বস্তিকর ঠেকছিল এলাকার বাসিন্দাদের কাছে। তাঁদের এই অস্বস্তি অনেককে মনে পড়িয়ে দিয়েছে শাহরুখ খান অভিনীত ‘মাই নেম ইজ খান’ ছবিটার কথা। সেখানে শাহরুখ যে চরিত্রটা করেছিলেন, সে একটা সময় খালি বলত, ‘মাই নেম ইজ খান অ্যান্ড আই অ্যাম নট এ টেরোরিস্ট’।
সেলিম জানান, এক দিকে যখন এলাকার বহু বাসিন্দাদের কাছ থেকেই তাঁরা এলাকার বাইরের ‘অস্বস্তিকর’ অভিজ্ঞতা শুনছেন, অন্য দিকে তখন জহিরুলের খোঁজ পেতে মসজিদ কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হন পুলিশ ও এনআইএ-র গোয়েন্দারা। ইমাম জাবের আলি বলেন, “জহিরুলের জন্য গোটা এলাকার বদনাম হচ্ছে। কী ভাবে ওর সঙ্গে জঙ্গিদের যোগ রয়েছে তা গোয়েন্দাদের কাছে থেকে জেনে দিন কয়েক আগে ঠিক করা হয়, এলাকাবাসীকে সচেতন করা হবে।”
থানারপাড়ার এই মসজিদে ফি শুক্রবার হাজারখানেক মহিলা-পুরুষ নমাজ পড়তে আসেন। এ দিন নমাজ পাঠ শুরু হওয়ার আগে ইমাম সকলের উদ্দেশে আবেদন করেন, জহিরুল সম্পর্কে কোনও তথ্য বা জহিরুলের খোঁজ পেলে মসজিদ কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ-প্রশাসনকে জানাতে। নমাজ শেষে বেরিয়ে এলাকার আব্দুল
কুদ্দুস মণ্ডল, সামসুজ্জোহারা বলছিলেন, “ইমাম ও মসজিদ কর্তৃপক্ষের কথাটা হেলাফেলা করার মতো নয়। সতর্ক থাকব।”
জহিরুলের বাবা জুয়াদ আলি শেখও এসেছিলেন নমাজ পড়তে। কোনও মতে বললেন, “ছেলের জন্য আজ সবার সামনে মসজিদের ঘোষণা শুনতে হল! বিশ্বাস করুন, ও কোথায় আছে, জানি না। জানলে আমিই প্রথমে মসজিদ ও থানায় খবর দেব।”

*****************

‘একে ৪৭’ লেখা ডায়েরিতে, দাবি ‘ও সব গজল’

গৌরব বিশ্বাস

কলকাতা, ২৫ অক্টোবর, ২০১৪, 

6

এনআইএ দল কথা বলছে জহিরুলের স্ত্রী খানসা বিবির সঙ্গে। শুক্রবার কল্লোল প্রামাণিকের তোলা ছবি।

স্বামীর নাম জড়িয়েছে খাগড়াগড়ের জঙ্গি-যোগে। স্ত্রী-র ডায়েরির পাতায়-পাতায় লেখা ‘জেহাদ’, ‘রক্ত’-এর মতো শব্দ, ‘হাতে তুলে নাও তরোয়াল, একে ৪৭’-এর মতো বাক্য। এ সব কী? জবাব এল, “গজল।” শুক্রবার ‘জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা’র (এনআইএ) গোয়েন্দাদের মুখোমুখি বসে এমনই জবাব দিয়েছেন খানসা বিবি। খাগড়াগড়-কাণ্ডে নদিয়ার থানারপাড়ার গমাখালি গ্রামের সন্দেহভাজন জহিরুল শেখের স্ত্রী।
জহিরুল পলাতক। খানসারও খোঁজ মিলছিল না। তবে এ দিন নিজস্ব সূত্রে নদিয়ারই করিমপুর থানা এলাকায় খানসার সন্ধান পায় এনআইএ। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, মুখোমুখি টানা আড়াই ঘণ্টার কথাবার্তায় খানসা তাদের কিছু প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। কিন্তু তদন্তে এগনোর মতো বিশেষ সূত্র দেননি। এই মুহূর্তে বছর তেইশের বধূটি রয়েছেন এনআইএ-র নজরে।
এনআইএ-র দুই গোয়েন্দা এ দিন দুপুর আড়াইটে নাগাদ পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হন করিমপুরে। তিন মাসের মেয়েকে কোলে নিয়ে উঠোনে বসা খানসার সঙ্গে শুরু হয় তাঁদের কথাবার্তা। গোয়েন্দাদের খানসা জানান, বিয়ের আগে তাঁর নাম ছিল শমিতা খাতুন। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত থানারপাড়ার একটি হাই-মাদ্রাসায় পড়েছেন। পরে বারবাকপুরের মাদ্রাসা থেকে মাধ্যমিক পাশ করেছেন।
বর্ধমানের মঙ্গলকোটের শিমুলিয়ায় যেখানে মহিলাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হত বলে এনআইএ-র সন্দেহ, সেখানে তিনি গেলেন কেন, কী করে? এনআইএ সূত্রের দাবি, প্রশ্নোত্তর-পর্বের এই জায়গা থেকে ‘বিভ্রান্তিকর’ তথ্য দিতে শুরু করেন জহিরুলের স্ত্রী। প্রথমে তিনি বলেন, “আরবি-শিক্ষার জন্য ওখানে গিয়েছিলাম।” কিন্তু শ্বশুরবাড়ি বা বাপের বাড়ি লাগোয়া এলাকায় আরবি ভাষা শিক্ষার জন্য একাধিক মাদ্রাসা থাকতেও তাঁকে শিমুলিয়ায় যেতে হল কেন? জবাব দেননি বধূটি।
গোয়েন্দাদের দাবি, জহিরুলের সঙ্গে তাঁর কবে বিয়ে হয়েছিল, তা নিয়েও ধন্দ তৈরির চেষ্টা করেছেন খানসা। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে গোয়েন্দারা জানতেন, বিয়ে হয়েছে ২০১০-এ। কিন্তু এ দিন তরুণী দাবি করেছেন, তাঁর বিয়ে হয় ২০১২ সালের ২৭ এপ্রিল।
খানসা ঠিক কবে শিমুলিয়ায় গিয়েছিলেন গোয়েন্দাদের খটকা রয়েছে তা নিয়েও। কারণ, এ দিন এক বার তিনি জানিয়েছেন, বিয়ের দু’মাস আগে থেকে তিনি আরবি শিক্ষার জন্য শিমুলিয়ায় গিয়েছিলেন। এক বার বলেছেন, “বিয়ের পরে স্বামীর সঙ্গে গিয়ে কিছু দিন শিমুলিয়ায় ছিলাম। তখন ওই মাদ্রাসায় পড়তাম।”
কিন্তু শিমুলিয়ায় জহিরুল কেন গিয়েছিল বা সেখানে থাকার সময় সে কী কাজ করত— খানসাকে জেরা করে সে প্রশ্নের জবাব গোয়েন্দারা পাননি। মহিলা দাবি করেছেন, তিনি জানেন না। শিমুলিয়ায় অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হত কি? এ প্রশ্নের জবাবে বধূটি বলেছেন, “শরীর ঠিক রাখার জন্য প্রতিদিন সকালে ১৫-২০ মিনিট ব্যায়াম করানো হতো। এর বেশি কিছু জানি না।”
খাগড়াগড়-কাণ্ডে ধৃত আলিমা বিবি বা রাজিয়া বিবিরা কি তাঁর সহপাঠী ছিলেন? বধূটি নিরুত্তর। বিস্ফোরণে হত শাকিল আহমেদ বা আহত আবদুল হাকিমকে কে দেখেছিলেন শিমুলিয়ায়? জবাব আসেনি এ প্রশ্নেরও।
জহিরুল কোথায় আছে জানতে চেয়েও সদুত্তর পাননি বলে দাবি গোয়েন্দাদের। খানসা তাঁদের জানিয়েছেন, ঈদের সময় তিনি জহিরুলের সঙ্গে গমাখালির শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিলেন। ঈদের পরেই (৭ অক্টোবর) জহিরুল ‘কাজে’ চলে যায়। খানসা ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে মায়ের সঙ্গে চলে আসেন বাপেরবাড়ি। তার পর থেকে জহিরুল স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে না।
এর পরে কথা শুরু হয় খানসার ডায়েরি (জহিরুলের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছিল) নিয়ে। ডায়েরিতে লেখা ‘জেহাদ’ বা ‘একে ৪৭’-এর প্রসঙ্গ তুলে গোয়েন্দারা জানতে চান, “জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন না কি?”
জবাব আসে, “এ সব গজলের লাইন। আমি গজল শুনতে ভালবাসি। তা থেকে পছন্দের শব্দ ডায়েরিতে লিখেছি।”

আরও - কাদের স্বার্থে বর্ধমান এস পি বিস্ফোরণের প্রমাণ নষ্ট করল এবং ভুল রিপোর্ট দিয়ে তদন্ত ভুলপথে চালিত করতে চাইলেন কাকে বাঁচাতে?

Friday, October 24, 2014

Burdwan blast:West Bengal Home Secretary denies presence of Al-Qaeda posters at blast site

Monday, 6 October 2014 - 7:50am IST | Place: Kolkata | Agency: PTI


  • Representational Image
West Bengal government on Sunday said a large amount of bomb-making material and 'incriminating' documents were seized from the blast site at Khagragarh in Burdwan district which claimed two lives on October two and that a high-level composite task force has been formed to investigate the matter. Addressing a press conference, state Home Secretary Basudeb Banerjee said that the state was also in touch with central agencies including NIA in this regard.
"A large number of chemicals have been used in bomb-making and much of these have been seized. Recovery has also been made of a large quantity of literature both printed as well as downloaded from the internet which basically relate to ways and means of making bombs and explosive devices," Banerjee said. Ruling out allegations of the state not cooperating with central agencies, he said a section of media had reported that NIA had said that state agencies were not cooperating with them. "I would like to deny this. Senior officials of both sides are in touch, it is a far serious matter between the Centre and the state," he said. "Certain media reports said that posters relating to al- Qaeda were found. No such posters have been found so far. Investigation is on," the Home Secretary said.
He, however, denied that RDX was found at the blast site as reported in a section of media. "A Central Forensic Science Laboratory (CFSL) team led by assistant director has since visited the place of occurrence on the very next day and they have inspected the site," he said. "CID has taken over the investigation and the DGP has since formed a composite task force with top officials from CID, district police, IB and Kolkata Police under the leadership of DIG CID," Banerjee said.
"The accused persons before the police arrived tried to destroy some materials by burning but a large number of incriminating documents, telephones etc have been recovered," he said. "Investigation is continuing to see whether it has further ramification or not," he added. Banerjee said that two persons have been arrested so far in connection with the case.These are Gulsana Bibi, wife of Shakil and Alima Bibi, wife of Abdul Halim. "They were produced before a court and have been given nine days' police custody," he said.

*******************
Suspected militants were keen to create turmoil during Durga puja and Eid celebrations in the state
  • By Archisman Dinda, Correspondent
  • Published: 17:34 October 6, 2014
  • Gulf News



Kolkata: Four days after a major blast at a Trinamool Congress leader’s house in Burdwan district of West Bengal, where three suspected terrorists were killed on October 2, the state government has ruled out the possibility of the involvement of Al Qaida.
While state Home Secretary Basudeb Banerjee refused to divulge details about the outfit that the investigation team was suspecting, he has ruled out the possibility of the international terror group.
“Certain media reports said that posters relating to Al Qaida were found. No such posters have been found so far. Investigation is on,” the Home Secretary said. He also denied reports of non-cooperation by the state police with the national agencies and that no RDX was found at the blast site as reported in a section of media.
“I would like to deny this, senior officials of both sides are in touch, it is a far more serious matter between the Centre and the state,” he said.
“A Central Forensic Science Laboratory (CFSL) team led by assistant director has since visited the place of occurrence the very next day and they have inspected the site. Criminal Investigation Department (CID) has taken over the investigation and the DG Police has since formed a composite task force with top officials from CID, district police, Intelligence Bureau and Kolkata Police under the leadership of DIG CID,” Banerjee said.
Investigators have so far arrested three people in connection with the blast. Hafez Mollah alias Hasan, who was detained by the CID from his house on Sunday, was formally arrested on Monday, DIG (Operations), CID Dilip Adak said.
Two other women — Rajira Bibi alias Rumi from Nadia and Amina Bibi from Murshidabad — were arrested on Sunday in connection with the blast in which involvement of terror outfits like Lashkar-e-Tayyiba and Harkat-ul-Jihad-al-Islami is being suspected. The police are on the lookout for a man named Abul Kalam, to whom several phone calls were made immediately after the blast.
Sources say that powerful grenades, chemicals used in making explosives, a book on how to trigger explosions, some jihadi literature, a video on jihadi training and maps of important locations in Kolkata were seized by the CID team from the house. A large number of watch dials, SIM cards and other tools required to make improvised explosive devices were also seized from the house.
“The group was certainly making powerful bombs and was trying to blast them during the Durga Puja and Eid festivities, the two biggest festivals in the state, to disturb the communal harmony. However, the bombs were triggered while being made, killing two people instantly and another later at the district hospital,” said a police official.
The state government is being blamed not only lack for police intelligence, as the suspected had rented the house a few months back, but also due to lack of preparedness against such evil forces.
“The state police is completely unprepared to handle any such forces. Not only lack of intelligence which is critical in fighting such forces, the police is not trained to investigate the issues properly, where critical evidence was lost due to manhandling of the blast site,” said an officer of the state home department.


**************


Burdwan Blast: 2 Women Arrested, Trinamool Denies Links
KOLKATA:  The ruling Trinamool Congress in West Bengal has come under fire for alleged involvement in anti-national activities after an explosion killed two people in Burdwan on Thursday. The CPM and the BJP say the police destroyed evidence before the National Investigation Team (NIA) could reach the spot.

The building where the blast took place - located in Khagragarh area - is owned by a former state government employee who is allegedly a Trinamool supporter. Some Trinamool flags were found stacked in one of the rooms on the ground floor. At one time, the Trinamool had also allegedly used a room in the house as an office. 
"A bomb blast took place inside the home of a TMC leader. In that house people of Indian Mujahideen were living. Some substance exploded and after which it was told that NIA should be informed. But NIA was informed 24 hours later. The material which could have been used as the evidence was destroyed in river... Mamata Banerjee should tell that if that home belongs to a TMC leader or not? Why did your SP of Burdwan destroy the evidence?" BJP leader Siddharth Nath Singh asked in Delhi. 

CPM leader Sitaram Yechuri said, "The track record of state police in recent years does not augur well. Central government should interfere and act against the guilty."

The Trinamool, denying any links with the blast, claimed the BJP and CPM were conspiring to disturb peace in the state at a sensitive time - the end of the Durga Pujas and the eve of Eid. 

"The comments by Biman Bose and the BJP are totally insensitive. The timing too is devious, especially at this juncture when Durga idols are still being immersed and the holy festival of Eid is to be held tomorrow," said Mukul Roy, Trinamool General Secretary.

The owner of the house where the blast occurred has been detained for questioning. Two women who lived as tenants there have been arrested. 

Meanwhile, in Kolkata this evening, principal secretary, home, Basudeb Banerjee, denied any RDX or Al Qaeda posters had been found at the blast site. He also denied reports about lack of cooperation between the state police and central agencies investigating the incident.

*****************
Return to frontpage

Updated: October 6, 2014 02:45 IST

Trinamool denies hand in Bardhaman blast


TMC leader Mukul Roy
The HinduTMC leader Mukul Roy
Denying the allegation that the Trinamool Congress had links with the blast at Khagragarh in Bardhaman (Burdwan) district last Thursday, party general secretary Mukul Roy said the investigation was following normal procedure. He lauded the police administration for a “proper and fast” investigation.
Two persons were killed and another was injured in the blast.
Earlier in the day, the Bharatiya Janata Party and the Communist Party of India (Marxist) charged the Trinamool with having links with the blast.
“How do we know if the BJP and the CPI(M) are not linked with the blast and is trying to create unrest in the State?” Mr. Roy asked. He alleged that the Opposition was making “irresponsible comments.” “Biman Bose, CPI(M) State secretary, and the BJP are trying to disturb the peace and thus denigrate the government ... by making irresponsible statements.”
Denying the allegation that the house where the blast occurred had a Trinamool office, Mr. Roy said it must be “substantiated.”
“Local people would have known, if the house had the Trinamool office. Electronic media would have filmed ... do you have any footage that establishes that the house had (party) office,” he asked.
“One may cook any allegation but it has to be substantiated. In the Babri Masjid demolition case, many allegations were made against BJP leaders, but nothing materialised,” he said.
BJP charge
BJP leader Siddharth Nath Singh said at a press conference in Delhi that Bangladeshi infiltrators had rented the housed. Mr. Singh said: “The local police destroyed all evidence” to “cover up the incident” so that the Trinamool remained “above suspicion.”
“The local police collected samples and destroyed it within seven hours. The evidence included mobile phones, ID, IM proofs and al-Qaeda’s jihadi literature. Since the Central forces were informed late, they could not reach on time. All these raise questions on the Mamata Banerjee government,” Mr. Singh said.
Central agency sources told The Hindu that their officials were not allowed entry into the house even two days after the explosion. However, West Bengal Home Secretary Basudeb Banerjee denied “non-cooperation” with the Central agencies.
West Bengal Left Front committee chairperson Biman Basu quoted newspaper reports to say pamphlets of “banned Muslim fundamentalist organisation” were recovered from the house. Later, the CPI(M) said in a statement that the Trinamool office was located in the house. “Soon after the explosion, the signboard of the Trinamool Congress was removed ... local people alleged that that the police tried to block the probe initially,” Mr. Bose said.
****************

More: 

Monday, October 20, 2014

Not all Madrasas are terrorists hubs, but don't hide those who shelters terrorists

প্রবন্ধ ১

পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান: ভুল ভাবে দেখব কেন

সেমন্তী ঘোষ (সৌজন্য - আনন্দবাজার পত্রিকা)

২১ অক্টোবর, ২০১৪, ০০:০১:৩৮

3

বিকল্পের অধিকার। রাজ্যের একটি মাদ্রাসায় পরীক্ষা দিতে বসেছে ছাত্রীরা, ফেব্রুয়ারি ২০১২

প্রথম দিকে খবরের কাগজে পড়ছিলাম, পশ্চিমবঙ্গের কিছু ‘ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান’-এর সঙ্গে জঙ্গি কার্যকলাপের যোগ পাওয়া গিয়েছে। কয়েক দিন ধরে চলল এই পরোক্ষ ইঙ্গিত। হঠাৎ দেখলাম, মাদ্রাসা শব্দটা চলেই এল কাগজের বিবরণে। জানা গেল, এমন কিছু তথ্যপ্রমাণ মিলছে যে শব্দটাকে আর পাশ কাটানোর উপায় নেই। টিভি চ্যানেলে অবশ্য এখনও কুণ্ঠা। বিজেপি ছাড়া প্রায় সকলেই অত্যন্ত দ্বিধা ও অনিচ্ছার সঙ্গে মাদ্রাসা শব্দটি মুখে আনছেন। বলে দিচ্ছেন, ব্যাপারটাকে ‘ও ভাবে’ দেখলে হবে না, মাদ্রাসা খুবই দরকারি প্রতিষ্ঠান, তাই বিষয়টা ‘ঠিকমতো’ বুঝতে হবে। কিন্তু ‘ঠিকমতো’টা কী রকম, তা পরিষ্কার হচ্ছে না, কেননা হয় তাঁরা মাদ্রাসা নিয়ে আলোচনায় মোটে রাজি নন, নয়তো তাতে স্বচ্ছন্দ নন।
দেখতে দেখতে দুশ্চিন্তা হয়। কেবল দুশ্চিন্তা নয়, ভয়। মাদ্রাসা কথাটা উচ্চারণ করতে বা লিখতে যেখানে এত অস্বস্তি, এবং উল্টো দিকে, মাদ্রাসা কথাটা উচ্চারণ করলেই যেখানে এত প্রতিক্রিয়া, সেখানে সত্যিকারের ভয়ের যে বিষয়, সেই আলোচনায় পৌছনো যাবে তো শেষ পর্যন্ত? একটি মাদ্রাসা মানেই তো সব মাদ্রাসা নয়, কিংবা মাদ্রাসা মানেই তো গোটা মুসলমান সমাজ নয়। তা হলে মাদ্রাসা কথাটা বলতে গিয়েই সমস্ত মুসলমান বাঙালিকে হারিয়ে ফেলার এই আশ্চর্য আতঙ্ক নিয়ে আমরা মূল সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করব কী করে?
একই সমস্যা অনুপ্রবেশ নিয়েও। লক্ষণীয়, পশ্চিমবঙ্গের ভোটমঞ্চে বিজেপির আবির্ভাবের আগে অনুপ্রবেশ শব্দটা কেমন অচ্ছুত ছিল। যেন ও কথা মুখ দিয়ে বার করেছ মানেই তুমি মুসলিমদের গাল দিচ্ছ। বাম-কংগ্রেস-তৃণমূল’-এর সম্মিলিত এই ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’ সর্বৈব ভাবেই ‘পলিটিক্যাল’, রাজনৈতিক, রাজনীতির ক্ষুদ্রতর অর্থে। কোনও দলীয় রাজনীতির মুসলিম-মনস্কতার অন্দরেই আসলে সমব্যথা নেই, মুসলিম মানুষদের প্রতি সত্যিকারের সহমর্মিতা নেই, আছে কেবল তাঁদের সংখ্যাটা ভোটের চরকিতে হারিয়ে ফেলার হিলহিলে ভয়। এই ভয়ের পথ ধরেই এক দিকে জঙ্গিদের জন্য রাজ্যময় ‘সেফ করিডর’ তৈরি হয়, অন্য দিকে রাজ্যে হিন্দুত্বের রাজনীতি জমাট হয়ে বসব-বসব করে।
অনুপ্রবেশকারীরা সকলেই মুসলিম নন, সেটা হওয়ার কোনও কারণও নেই। কয়েক দশক জুড়ে দেখা গিয়েছে নানা ধর্মের, নানা জাতের অনুপ্রবেশকে কী ভাবে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে এ রাজ্যের রাজনীতি, রাজনীতির নিজেরই স্বার্থে। কিন্তু এই মুহূর্তে পরিস্থিতি অন্য রকম। হঠাৎই অনুপ্রবেশ কথাটাকে টেনে এনেছে বিজেপি। তাদের সদর্প ঘোষণা, ও পার থেকে যে হিন্দুরা আসছেন তাঁরা শরণার্থী, আর মুসলিমরা, অনুপ্রবেশকারী! তেমন প্রতিবাদও হচ্ছে না কথাটার। অ-বিজেপিরা ধরেই নিয়েছেন, অনুপ্রবেশকারীরা একশো ভাগই মুসলিম, তাই অনুপ্রবেশ মানেই মুসলমান, মুসলমান মানেই অনুপ্রবেশ, এ নিয়ে একটি কথাও যেন মুখ ফসকে না বেরোয়! তাই অনুপ্রবেশ যে একটি জরুরি সমস্যা, এবং সেই সমস্যার যে একটা ঠিকঠাক সমাধান দরকার, তেমন কথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর মুখে এখনও শোনা যায়নি।
ঠিক যেমন, বর্ধমানের জঙ্গি সংযোগ নিয়ে কিছুই শোনা যায়নি তাঁর মুখে। অথচ জঙ্গলমহলে গিয়ে কিন্তু তিনি বলেছেন, ‘দেখবেন, এখানে যেন আবার ও-সব না হয়।’ এই নীরবতা গুরুতর, কেননা ধরেই নেওয়া যায়, তিনি বা তাঁর দল যথেষ্ট চিন্তিত এ বিষয়ে। যদি সত্যিই প্রমাণ লোপাটের ব্যবস্থা হয়ে থাকে, যদি অপরাধীকে সত্যিই আড়াল করা হয়ে থাকে, তবে তার পিছনে সম্ভবত জঙ্গিপনার প্রতি সচেতন প্রশ্রয় নেই। আছে কেবল, মুসলিম সমর্থন হারিয়ে ফেলার ঘুম-কাড়া ভয়!
অথচ একটা অত্যন্ত সহজ ‘যুক্তি’ (‘লজিক্যাল প্রোপোজিশন’) হল, মুসলিমদের মধ্যে জঙ্গি আছে বলে সব মুসলিমই জঙ্গি নয়! জঙ্গিসংযুক্ত মাদ্রাসা নিয়ে কথা বললে এগুলোর সঙ্গে যুক্ত যাঁরা, তাঁরা চটতে পারেন, কিন্তু ‘সব মুসলিম’ চটবেন না, কেননা ‘সব মুসলিম’ জঙ্গিমনস্ক তো ননই, ‘সব মুসলিম’ মাদ্রাসাতেও যান না। এমনকী যাঁরা মাদ্রাসায় যান, তাঁরাও মাদ্রাসাটি জঙ্গিসংযুক্ত জেনে সেখানে যান না, আর মাদ্রাসাটিকে জঙ্গি-সংযুক্ত জানতে পারলে সেটা সমর্থনও করেন না। যদি সংখ্যার কথাই ধরা যায়, তবে এই মুসলিমরা জঙ্গিদের চেয়ে লক্ষগুণ বেশি। জঙ্গিপনাকে প্রশ্রয় দিয়ে এত লক্ষ মুসলিম ভোট পাওয়ার ভাবনা যদি কেউ ভাবেন, একেবারে ভুল ভাবছেন!
মুশকিল হল, খবরের দুনিয়ায় যেহেতু ভয়ঙ্কর খবর ছাড়া কিছুর জায়গা হয় না, ‘সেনসেশনাল’ ছাড়া অন্য কথা প্রচার-যোগ্যতা অর্জন করে উঠতে পারে না, তাই ভয়হীনতার স্বাভাবিক, দৈনন্দিন বিবরণগুলো ‘খবর’ হয়ে আত্মপ্রকাশ করে না। কোন মাদ্রাসায় জঙ্গিপনা চলছে, সেটা সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞাপিত ও বিজ্ঞাপিত হয়। আর কোন মাদ্রাসা দিনের পর দিন ছেলেমেয়েদের পড়িয়ে-শুনিয়ে চলেছে, সেটা খবরযোগ্যতার ধারেকাছেও আসে না। জঙ্গিপনায় যুক্ত মুসলিমদের হাল-হকিকত মুখে মুখে ফেরে, সর্বজনজ্ঞানে উন্নীত হয়। তাঁদের চেয়ে সংখ্যায় লক্ষ গুণ বেশি রাজ্যের যে মুসলিমদের হাজারো এটা-ওটা ভাবনার মধ্যে জঙ্গি শব্দটা জায়গাও পায় না মোটে, তাঁদের কথা আমরা কাগজে পড়ি না, তাই জানি না, শুনি না।      
সমস্যাটা হল, এই দ্বিতীয় দলের কথা শুনি না বলে তাঁরা নেই, এটাই ধরে নিই। আর প্রথম দলের কথা শুনি বলে তাঁদের থাকাটা রমরম করে আমাদের চার পাশে বাজতে থাকে। এই ভাবে খবর হয়ে ওঠে অতি-খবর, বাস্তব হয়ে ওঠে অতি-বাস্তব। তার মধ্যেই দুটো-তিনটে কথা ছিটকে খবর হয়ে ওঠার হাঁচোড়পাচোড় চেষ্টা করে, তার পর ব্যর্থ হয়ে তলিয়ে যায়। এই রকম একটা-দুটো ছিটকানো কথাতেই আমরা জানতে পারি খাগড়াগড়ের সেই দুই মেয়ের ধর্মভীরু বাবার কথা, যিনি অভিযুক্ত মাদ্রাসাটিতে মেয়েদের পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন তারা ধর্মশিক্ষা পাচ্ছে বলে, কিন্তু এখন সব দেখেশুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এ কোথায় তিনি কন্যাদের ঠেলে দিয়েছেন তাই অনুধাবন করে। কিংবা জানতে পারি, জঙ্গিপুর মুনিরিয়া হাই মাদ্রাসায় আয়োজিত ইমামদের সভার কথা, যেখানে উদ্বিগ্ন ইমামরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, শিশুদের শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামগুলির সম্প্রীতি রক্ষার কাজে তাঁদেরই এগিয়ে আসতে হবে, সন্ত্রাসের বীজ অঙ্কুরেই নষ্ট করতে হবে। জানতে পারি, কলকাতায় রবিবার অ্যাকাডেমি চত্বরে সভাটির কথা, যেখানে অন্য নানা কথার পাশাপাশি বিপথগামী মাদ্রাসাগুলিকে কী ভাবে বন্ধ করা যায়, সেই আলাপও চলছিল।
মাদ্রাসা শিক্ষার আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, মাদ্রাসা চালু রাখার যুক্তি বা প্রতিযুক্তি ঠিক কী কী, কোনও মাদ্রাসার জঙ্গিসংযোগ তৈরি হলে কী করণীয়: মাদ্রাসা শুনলেই ক্ষেপে উঠে, কিংবা মাদ্রাসা শব্দটা না উচ্চারণ করে, কিংবা মাদ্রাসা শব্দ উচ্চারণ-মাত্রেই প্রবল রক্ষণাত্মক হয়ে গেলে কিন্তু এই অতি জরুরি আলোচনাগুলি শুরুই করা যাবে না। অথচ, যে ধর্মশিক্ষার জন্য মাদ্রাসার প্রয়োজন, সেই ধর্মশিক্ষার পথটাই যে খুঁজেপেতে ব্যবহার করে অনিষ্টকামীরা, এটা কেবল পশ্চিমবঙ্গে বা ভারতে বা আমেরিকায় সত্যি নয়, পাকিস্তানে, ইরাকে, সিরিয়াতেও সত্যি। পাকিস্তানের প্রবীণ গবেষক আকবর আহমদ একটি অসামান্য বই লিখেছিলেন (জার্নি ইনটু ইসলাম, ২০০৭) তাঁর বহু দেশের অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে, যাতে পড়েছিলাম কী ভাবে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন মাদ্রাসাকে ব্যবহার করা হয় সন্ত্রাস ছড়ানোর কাজে কিন্তু সেই সন্ত্রাসের লক্ষ্য ভিন্ন ধর্ম বা ভিন্ন সংস্কৃতি নয়, বরং মুসলিমরাই। কখনও সেই সন্ত্রাসের লক্ষ্য শিয়ারা, কিংবা সুন্নিরা, কিংবা অন্য কোনও গোষ্ঠীর মুসলিমরা। অর্থাৎ মাদ্রাসা ক্ষেত্রবিশেষে অসহিষ্ণুতা ও জঙ্গিপনার কেন্দ্র হয়, আর ধর্মচর্চার আবরণটা সেই কার্যক্রমের উপযুক্ত আড়াল হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক জাল ধরে জঙ্গি ইসলামি সংগঠনের টাকাপয়সা, লোকবল, অস্ত্রশস্ত্র পৌঁছয় সেখানে। সুতরাং ধর্মশিক্ষার প্রয়োজনেও এ রাজ্যে মাদ্রাসা সত্যিই কতটা দরকার, এবং মাদ্রাসা দরকারি ধরে নিলেও সেগুলিকে ঠিক পথে রাখার উপায় কী, এ সব কেবল অ-মুসলিম নয়, মুসলিমদেরও উদ্বিগ্ন হয়ে ভাবার বিষয়। তাঁরা তা ভাবছেনও।
তাঁরা যে ভাবছেন, তার প্রমাণ গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে। পাকিস্তান, ইরাক, ইরান, সিরিয়া, সর্বত্র। ঘরের কাছে বাংলাদেশ দেখিয়ে দিচ্ছে, কত প্রতিকূলতার মধ্যেও কতখানি করা সম্ভব। মৌলবাদী তাণ্ডব সেখানে প্রাত্যহিক। কিন্তু যত বেশি দুর্দশা ঘটাতে পারত সেই তাণ্ডব, সেটা হয়নি, হয় না, কেননা গোটা সমাজ বার বার হাত মিলিয়ে চেষ্টা করে জঙ্গিপনার টুঁটি টিপে ধরার। সীমান্তবর্তী জেলাগুলির গ্রামে গ্রামে প্রতি দিন চলে গ্রামবাসী বনাম মৌলবাদী সংঘর্ষ। এই গ্রামবাসীরা মুসলিম রাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিক। তাঁদেরই অনেকে আবার মৌলবাদী বা সন্ত্রাসী না হয়েও দারিদ্র ও অশান্তির চোটে ভারতের দিকে যাত্রা করেন, অনুপ্রবেশকারীতে রূপান্তরিত হন। তাঁদের সঙ্গে মিশে যায় জঙ্গিরাও। জঙ্গিরা অনুপ্রবেশকারী বলে সব অনুপ্রবেশকারীরই জঙ্গি-যোগ থাকে না।
বাস্তব হলেও এই বিরাট-সংখ্যক অনুপ্রবেশ গ্রহণযোগ্য নয়। ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের কি এত অতিরিক্ত মানুষকে নিজের দেশে আত্মস্থ করে নেওয়ার পরিস্থিতি আছে? নেই। সুতরাং এই মানুষগুলোর বিষয়ে একটা নীতি দরকার। কিন্তু এই নীতিটা কী জন্য দরকার? ‘মুসলিম’ সমস্যা নয়, ‘অনুপ্রবেশ’ সমস্যা সমাধানের জন্য। মুসলিম আর অনুপ্রবেশের মধ্যে, কিংবা মুসলিম আর মাদ্রাসার মধ্যে এ ভাবে সহজ সমার্থক চিহ্ন জুড়ে দেওয়া অঙ্কের ভয়ঙ্কর ভুল, অকারণ সংঘর্ষ ডেকে আনার ভুল। যে  রাজ্যের এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম, সেখানে এই ভুলের দাম প্রতিটি পরিবারকে চোকাতে হতে পারে।
বন্ধ হোক এই আগুনখেলা। হিন্দু সমস্যা বা মুসলিম সমস্যা নয়, পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা যে আজ গুরুতর হয়েছে, সব পক্ষ সেটা স্বীকার করুক। একত্র আলোচনা করুক। যদি একত্র আলোচনায় রুচি না থাকে, তবে না-হয় নিজেদের সমাজের মধ্যেই আলোচনা চলুক। কিন্তু সমস্যাটা যে ধর্মের নয়, সমাজের, অর্থনীতির, রাজনীতির, প্রত্যেকের খেয়াল থাকুক। এবং সমস্যাটা যে সমগ্র রাজ্যের, প্রত্যেক রাজ্যবাসীর— সেটাও।

**************

প্রবন্ধ ২

মাদ্রাসা সম্পর্কে আগে জেনে নেওয়া ভাল

কাজি মাসুম আখতার (সৌজন্য - আনন্দবাজার পত্রিকা)

২১ অক্টোবর, ২০১৪, ০০:০১:৫২
4

বৃক্ষরোপণ। রাজ্যের একটি মাদ্রাসায়। ২০০৮

রাজ্যের অনুমোদনহীন খারেজি মাদ্রাসাগুলি সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া— প্রায় এক দশক আগে মন্তব্য করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বর্ধমান বিস্ফোরণের সূত্রে মন্তব্যটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।  এই কাণ্ডকে ঘিরে তদন্তে যে-ভাবে জঙ্গি কার্যকলাপে মাদ্রাসার যোগসূত্র উঠে এসেছে, তা সত্যিই উদ্বেগের। মনে হতেই পারে যে মাদ্রাসাগুলিই যেন জঙ্গি তৎপরতার মূল কেন্দ্র। বিষয়টি গভীর উদ্বেগের, কারণ এই প্রশ্নে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে রাজ্যের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য।
মাদ্রাসা সম্পর্কে বিভ্রান্তির পিছনে রয়েছে মাদ্রাসা তথা ইসলাম ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অ-মুসলিমদের একাংশের অজ্ঞতা ও উপেক্ষা। বিভ্রান্তি শুরু হয় ‘মাদ্রাসা’ শব্দটি থেকেই। বিদ্যালয়কে যেমন ইংরাজিতে স্কুল বলা হয়, তেমনই আরবিতে বলা হয় ‘মাদ্রাসা’। পশ্চিমবঙ্গে মূলত তিন ধনের মাদ্রাসা রয়েছে। ১) অনুমোদন প্রাপ্ত ও সরকারি অনুদান প্রাপ্ত। ২) অনুমোদন প্রাপ্ত, কিন্তু সরকারি অনুদানে বঞ্চিত। ৩) অনুমোদনবিহীন ও অনুদানবিহীন। রাজ্যে প্রথম ধরনের মাদ্রাসার সংখ্যা ৬১৪টি। যার মধ্যে হাইমাদ্রাসা ৫১২টি এবং সিনিয়র মাদ্রাসা ১০২টি। মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদ-এর অধীনে থাকা হাই মাদ্রাসাগুলির পাঠ্যক্রম একেবারেই সাধারণ বিদ্যালয়গুলির অনুরূপ। বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক স্তরে পড়ুয়ারা সাতশো নম্বরের যে আধুনিক পরীক্ষা দেয়, মাদ্রাসার পড়ুয়াদের তার সঙ্গে অতিরিক্ত একশো নম্বরের ‘ইসলাম পরিচয়’ ও ‘কমপালসারি অ্যাডিশনাল’ হিসেবে তৃতীয় ভাষা আরবি-র পরীক্ষায় বসতে হয়, যার নম্বর রেজাল্টের মোট নম্বরের সঙ্গে যুক্ত হয় না। পার্থক্য এইটুকুই। বিষয়টিকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে সংস্কৃত শিক্ষার বিকল্প বলা যায়। হাই মাদ্রাসার উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পাঠক্রম ও পরীক্ষা পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভাবে সাধারণ বিদ্যালয়ের মতো উচ্চ মাধ্যমিক কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণাধীন। এখানে ধর্মীয় শিক্ষার কোনও বালাই নেই। সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিযুক্ত কিছু হাই মাদ্রাসায় শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই অ-মুসলিম। পড়ুয়াদের মধ্যেও অ-মুসলিম রয়েছে। সরকারি বেতন কাঠামোয় মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন বিদ্যালয় শিক্ষকদের সমান। তাই অনেক উচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষককেও হাই মাদ্রাসায় দেখা যায়।
সিনিয়র মাদ্রাসার ক্ষেত্রে মাধ্যমিক স্তরে (আলিম) এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে (ফাজিল) পাঠক্রমে ধর্মীয় শিক্ষার ভাগ তুলনায় বেশি। তবে হাই ও সিনিয়র, দুই ধরনের মাদ্রাসাই সাধারণ স্কুলের মতো জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক দফতর কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। মাদ্রাসাগুলিও সর্বশিক্ষা মিশন বা শিক্ষা দফতর প্রদেয় বিভিন্ন গ্রান্ট সমান ভাবে পায়। সঙ্গে বাড়তি হিসাবে পায় সংখ্যালঘু দফতর সূত্রে প্রাপ্ত আর্থিক অনুদান।
এ ছাড়া রয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা দফতর অনুমোদিত প্রায় পাঁচশো শিশুশিক্ষা কেন্দ্র (চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত) এবং মাদ্রাসা শিক্ষাকেন্দ্র (অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত)। এখানে শিক্ষকরা সাম্মানিক বেতনস্বরূপ সামান্য অর্থ পান। পরিকাঠামোর উন্নয়নেও সরকারি অনুদান বরাদ্দ হয়। মাদ্রাসা পর্ষদের পাঠক্রম অনুযায়ী পঠনপাঠন হয়।
পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় ধরনের মাদ্রাসার সংখ্যা ২৩৫টি। এগুলি মাদ্রাসা পর্ষদ কর্তৃক অনুমোদিত এবং মাদ্রাসা পর্ষদের পাঠক্রম অনুযায়ী পরিচালিত। তবে সরকারি অনুদান থেকে তারা বঞ্চিত। বিভিন্ন ধরনের দান এবং পড়ুয়াদের বেতন এই মাদ্রাসাগুলির আয়ের উৎস।
বর্ধমান বিস্ফোরণ কাণ্ডের প্রেক্ষিতে বিতর্ক উঠেছে তৃতীয় ধরনের মাদ্রাসাগুলি নিয়ে। যার নাম খারেজি মাদ্রাসা। খারেজি কথার অর্থ ‘বাহিরে’। এ কথার অর্থ অনুমোদনের বাহিরে অর্থাৎ অনুমোদনহীন। রাজ্যে এমন মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার, যদিও, সম্ভবত ভ্রান্তিবশত, মুখ্যমন্ত্রী দশ হাজার খারেজি মাদ্রাসাকে অনুমোদন দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু অনুমোদন দেবেন, অনুদান দেবেন না— তাই মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় সাড়া দেয়নি খারেজি মাদ্রাসাগুলি। অনুমোদনের শর্তস্বরূপ নিজস্ব জমি, বাড়ি, পর্যাপ্ত শিক্ষক, পড়াশুনোর পরিবেশ ইত্যাদি না থাকায় মাদ্রাসাগুলি অনুমোদন প্রাপ্তির জন্য আবেদনই করেনি। তাই ঘোষণার তিন বছর পরে মাত্র ২৩৫টি খারেজি মাদ্রাসা অনুমোদন পেয়ে মাদ্রাসা পর্ষদের পাঠক্রম অনুসরণ করছে।
অত্যন্ত গরিব মুসলিম পরিবারের সন্তানরাই সাধারণত খারেজি মাদ্রাসার পড়ুয়া হয়। সন্তানদের হাফেজ, ইমাম বা মোয়াজ্জেম তৈরি করাই এখানে অভিভাবকদের মূল লক্ষ্য। তা ছাড়া, অধিকাংশ খারেজি মাদ্রাসা আবাসিক হওয়ায় প্রায় বিনা ব্যয়ে অনাথ বা হতদরিদ্র পড়ুয়ারা দু’বেলা অন্ন গ্রহণের সুযোগ পায়। সাধারণত বাড়ি-বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা ‘দান’ বা ‘জাকত’ এই সব মাদ্রাসার অর্থ জোগানের উৎস। মূলত মসজিদ লাগোয়া ছোট কয়েকটি কক্ষ নিয়েই খারেজি মাদ্রাসাগুলি গড়ে ওঠে। কিছু খারেজি মাদ্রাসায় বাংলা-ইংরাজি পড়ানো হলেও আরবি-উর্দুসহ ধর্মশিক্ষা দেওয়াই এই সব মাদ্রাসার মূল লক্ষ্য।
এই খারেজি মাদ্রাসাগুলি একাধিক সমস্যায় জর্জরিত। প্রথমটি হল যোগ্য নজরদারির সমস্যা। আর্থিক সাহায্য তো দূরের কথা, সরকার তথা মুসলিম সমাজের অগ্রসর সচেতন অংশের বিন্দুমাত্র নজরদারি থেকে বঞ্চিত এগুলি। বর্ধমানের শিমুলিয়া মাদ্রাসা-সহ আরও কয়েকটি খারেজি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে যে-ভাবে জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে, তা সম্ভব হয়েছে যোগ্য নজরদারির অভাবেই।
দ্বিতীয়ত, ফুরফুরা, দেহবন্দ, আহলে হাদিস বা বেরেলি গোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত খারেজি মাদ্রাসাগুলির পরিকাঠামো বা শিক্ষার পরিবেশ মন্দের ভাল হলেও অধিকাংশ খারেজি মাদ্রাসার পরিকাঠামোগত দৈন্য দশা বড়ই প্রকট। ফলস্বরূপ প্রকৃত শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত অসচেতন এই সব মাদ্রাসার পড়ুয়াদের বিভ্রান্ত করা বেশ সহজ। ধর্মীয় আবেগে ইন্ধন দিয়ে এই পড়ুয়াদের উগ্রবাদী কর্মে লিপ্ত করাও অনেক সময় কঠিন নয়।
তৃতীয়ত, মাত্র দুই-আড়াই হাজার টাকা বেতনের অদক্ষ শিক্ষক দ্বারা পরিকাঠামোহীন মাদ্রাসায় পড়ুয়ারা না পায় উন্নত অর্থকরী আধুনিক শিক্ষা, না পায় উন্নত জ্ঞানভিত্তিক ধর্মশিক্ষা বা আরবি-উর্দু শিক্ষা। অর্থ না বুঝে আরবি ভাষা শিক্ষায় ভাষাজ্ঞান বা ধর্মজ্ঞান কোনওটাই সম্পূর্ণ হয় না। বস্তুত, শুধু খারেজি মাদ্রাসায় কেন, দেহবন্দ, মোরাদাবাদ, সাহারনপুর ইত্যাদি ইসলাম ধর্ম ও ভাষা শিক্ষা কেন্দ্রের মতো পশ্চিমবঙ্গের কোথাও উন্নত আরবি ভাষা বা ধর্মচর্চার কেন্দ্র নেই। এ রাজ্যে শিক্ষা নেওয়া মাদ্রাসা শিক্ষক, এমনকী কলেজের আরবি ভাষার শিক্ষকদের মধ্যেও খুব কমই আরবিতে দু’পাতা রচনা লেখার ক্ষমতা রাখেন। আরবি শিখতে কলকাতার গোলপার্কে রামকৃষ্ণ মিশনে দৌড়তে হয় হিন্দু-মুসলমান সকলকেই। প্রসঙ্গত, কোনও ভাষাই কোনও একটি ধর্মের একচেটিয়া হতে পারে না। আরবি বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ভাষা। মিশরে এই আরবি ভাষাতেই ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হয়। পশ্চিম এশিয়ায় ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং পেশায় নিযুক্তদের একটা বড় অংশ ভারতীয় হিন্দু। পেশাগত কারণেই তাঁদের আরবি শিখতে হয়।
বর্ধমানকাণ্ডে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক, গুঁড়িয়ে দেওয়া হোক অপরাধী মাদ্রাসাগুলিকে। শুধু স্বাগত জানানো নয়, মুসলিম সমাজকে এই প্রচেষ্টায় পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে। এবং, শুধু সরকারের নয়, মুসলিম সমাজপতি বা অগ্রসর অংশকে এগিয়ে আসতে হবে খারেজি মাদ্রাসাগুলির প্রকৃত উন্নয়নে বা নজরদারিতে। চেষ্টা করতে হবে খারেজি মাদ্রাসাগুলিকে সরকারি অনুমোদনের আওতায় আনার।
তবে মনে রাখতে হবে, অনুমোদন না পেলেও সংবিধানের ৩০ নং ধারা অনুযায়ী সংখ্যালঘুদের ‘ধর্ম শিক্ষা কেন্দ্র’ খোলার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। সুতরাং, অনুমোদনহীন মাদ্রাসাকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দেওয়ার যে প্রচেষ্টা চলছে, তাও ভ্রান্তিকর ও বিদ্বেষমূলক। রাজ্য বা দেশ জুড়ে চলছে বহু টোল বা চতুষ্পাঠী, যেখানে বেদ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি হিন্দু ধর্মশাস্ত্রই পড়ানো হয়। সুতরাং, ধর্মশিক্ষাকে অবৈধ ও সন্ত্রাসী বলে বৈষম্য সৃষ্টি অশুভ প্রচেষ্টা ছাড়া কিছু নয়।

তালপুকুর আড়া হাই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক

*************

সম্পাদকীয় ২ (সৌজন্য - আনন্দবাজার পত্রিকা)

নীতি স্থির করুন

২১ অক্টোবর, ২০১৪, ০০:০১:৩৮


ব্যাধি দুরারোগ্য হইলে মানুষ উদ্ভ্রান্ত হইয়া পড়ে, কখনও এই চিকিৎসকের কাছে দৌড়য়, কখনও ওই টোটকা দিয়া দেখে, কখনও বা সেই দেবতার থানে ধর্না দেয়। সিপিআইএমের ব্যাধি যে দুরারোগ্য হইয়াছে, তাহা দলের নেতাদের আচরণেই প্রকট। বর্ধমানের সন্ত্রাস তাঁহাদের সম্পূর্ণ বেসামাল করিয়া দিয়াছে। এই ঘটনা হইতে উদ্ভূত জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলায় দলনেতারা বিচিত্র আচরণ করিতেছেন, তাঁহাদের কণ্ঠে বিচিত্র সব সওয়াল শোনা যাইতেছে। আবার, এক নেতার কথার বিরূপ প্রতিক্রিয়া হইতে পারে, এই আশঙ্কায় আর এক নেতা ভারসাম্য আনিবার তাগিদে আর এক কথা বলিতেছেন এবং সেই কথারও কোনও যুক্তি খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছে না। প্রকাশ কারাট সম্প্রতি বলিয়াছেন, বর্ধমানের তদন্তভার এনআইএ-র হাতে দেওয়াই ঠিক হইয়াছে। কথাটি ভুল নহে, কিন্তু কথা ঠিক হইলেই প্রকাশ কারাট সে কথা বলিয়া থাকেন, এমন দুর্নাম তাঁহাকে কেহ দিবে না। রাজ্য পুলিশের বদলে এনআইএ’র তদন্ত চাহিয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্য প্রশাসনের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করা যায়, সেই কারণেই যে সিপিআইএম-এর কর্ণধার কথাটি বলিয়াছেন, তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু এই উক্তি তাঁহার বঙ্গীয় সতীর্থদের চিন্তায় ফেলিয়া দিয়াছে যে, এই অবস্থান সংখ্যালঘু ভোটের ক্ষতি করিবে না তো?
এনআইএ তদন্ত শুরু করিবার পরে ঘটনাচক্র যে দিকে চলিতেছে, তাহার ফলে এমন আশঙ্কার কারণ বুঝিতে অসুবিধা নাই। সিপিআইএম দীর্ঘদিন এ রাজ্যে, বিশেষত দক্ষিণবঙ্গে সংখ্যালঘু ভোটের প্রধান প্রাপক ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ভাণ্ডারে প্রবল ধস নামাইয়া দিয়াছেন। তিনি সংখ্যালঘু ভোটের জন্য যাহা করিয়াছেন, তাহা অনেকাংশে আপত্তিকর এবং এমনকী বিপজ্জনক, কিন্তু ভোট ব্যাঙ্কের মাপকাঠিতে তাঁহার সাফল্য অনস্বীকার্য। ফলে প্রকাশ কারাটের উক্তির পরে আসরে নামিয়াছেন গৌতম দেব। তিনি ঘোষণা করিয়াছেন, তাঁহারা ‘উদ্বাস্তু’দের পক্ষে ছিলেন, আছেন, থাকিবেন।
আপাতশ্রবণে পুরানো ও বহুচর্চিত, কিন্তু গৌতমবাবুর উক্তির প্রেক্ষিতটি তাৎপর্যপূর্ণ। বর্ধমান কাণ্ডের পরে নূতন করিয়া উঠিয়া আসিয়াছে ‘অনুপ্রবেশ’ প্রশ্ন, এই প্রশ্নে বিজেপি’র রাজনৈতিক প্রচার ক্রমে উচ্চরব হইতেছে। সংখ্যালঘু ভোটের পক্ষে প্রশ্নটি গুরুতর বলিয়াই রাজ্য রাজনীতির প্রচলিত ধারণা। সুতরাং ‘উদ্বাস্তু রাজনীতি’র মোড়কে সিপিআইএম নেতা বুঝাইতে চাহিয়াছেন, তাঁহারা অনুপ্রবেশকে সমস্যা বলিয়া মনে করেন না। নীতিগত ভাবে অবস্থানটি অযৌক্তিক এবং বিপজ্জনক। গৌতম দেব এবং তাঁহার দলের বিলক্ষণ জানা আছে, ‘উদ্বাস্তু’ বা ‘শরণার্থী’ শব্দগুলির আড়ালে বেআইনি অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণের বাস্তব প্রয়োজনকে লুকানো সম্ভবপর নহে। ভোটের সুবিধা হইলেও তাহা করা উচিত নহে, কারণ রাজ্যের স্বার্থ ভোটের স্বার্থ অপেক্ষা অনেক বড়। কিন্তু এই প্রচারে সংখ্যালঘু ভোটের কী সুবিধা বামপন্থীরা পাইবেন, তাহাও বলা কঠিন। এখানেই উদ্ভ্রান্তির সুস্পষ্ট প্রমাণ। এই সম্পূর্ণ দিশাহারা অবস্থা হইতে মুক্তি চাহিলে সিপিআইএমকে আপন নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করিতে হইবে। এক মুখে এনআইএ ডাকিয়া জাতীয়তাবাদী হইব, অন্য মুখে ভোটব্যাঙ্ক রাখিতে অনুপ্রবেশের সমস্যাকে তুচ্ছ করিব— এই ‘ভারসাম্য’-এর রাজনীতি আত্মঘাতী, রাজ্যের পক্ষে ক্ষতিকরও।


Sinister plot by minority leaders to hide Burdwan Blast terrorists

Burdwan Blast - Why Bengal police tried to undermine the incident